ভেঙে দিয়েছেন সমাজের গণ্ডি! দিব্যি ক্যাফে চালাচ্ছেন বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মীরা, সমাজকে নতুন পথের দিশা দেখাচ্ছে কলকাতার এই ক্যাফে

কাঁপা কাঁপা হাতে কফির কাপটি টেবিলে রেখে গেলেন অরিত্র। হাত কাঁপলেও, এক ফোঁটা কফিও কাপ থেকে বেরিয়ে যায়নি। অন্যদিকে, শ‍্যামল রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। বিকাশ মাঝেমাঝেই রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে কাজের অগ্রগতি দেখছেন। অরিত্র, শ‍্যামল, বিকাশ— সমাজের চোখে ‘বিশেষ’, ‘স্বাভাবিক’ নন। কেউ ডাউন সিনড্রোমে ভুগছেন, কেউ বা অটিস্টিক। সকলেই আঠারো পেরিয়েছেন, তবে মনে মনে এখনও শিশু। অথচ, এরাই পরিচালনা করছেন গোটা ‘অপরচুনিটি ক‍্যাফে অ্যান্ড কোওয়ার্কস’।

‘স্পেশাল চাইল্ড’ মানেই সব কাজে অক্ষম, এমন ধারণা সমাজের অনেকের। সেই ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন এই ক‍্যাফের নয়জন কর্মী। এ বছরের শুরুতে তাদের যাত্রা শুরু। এখন সেখানে গেলে সবকিছু বেশ পরিপাটি দেখা যায়। সকলেই অভ‍্যস্ত হয়ে উঠেছেন। সঠিক প্রশিক্ষণ, সুযোগ আর ইচ্ছাশক্তির জোরে তারা সমাজের বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন।

এই কর্মকাণ্ডের পেছনে আছেন ক‍্যাফের কর্ণধার সিদ্ধান্ত ঘোষ। পেশায় আইনজীবী, সিদ্ধান্ত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালনা করেন, যেখানে অটিজ়ম ও ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করেন। ক‍্যাফের কর্মীদের মধ্যে কয়েকজন অনাথ, যাদের জন্ম থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহ মেলেনি। আবার কিছুজন বাড়ি থেকে এসে কাজ করেন। সিদ্ধান্ত বলেন, “আমরা ভাবি যে, অটিস্টিকরা কিছু করতে পারবেন না। সেই ধারণা বদলাতে চেয়েছিলাম। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ দিলে তারাও অনেক কিছু করতে পারেন। প্রশিক্ষণ সময়সাপেক্ষ, তবে ধৈর্য ধরলে তারা সব করতে সক্ষম।”

অরিত্র, শ‍্যামল, অরিত্রীদের কাজের দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ ছিল অনেকের। কিন্তু ক‍্যাফেতে এসে তাদের সংশয় অনেকটাই কেটেছে। সিদ্ধান্ত বলেন, “অনেক সময় বাবা-মায়েরাও হাল ছেড়ে দেন, ধরে নেন যে জীবনে কিছু করার নেই।” মনোরোগ চিকিৎসক সঞ্জয় গর্গ বলেন, “অটিজমের বিভিন্ন স্তরে কাজের অসুবিধা নেই। সমস্যাটা মেলামেশা ও পুনরাবৃত্তিতে। সঠিক সময়ে রোগ ধরা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সমাজে সচেতনতা কম, ভ্রান্ত ধারণা বেশি। সুযোগ না পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তবে সঠিক সুযোগ পেলে, তারা সব করতে সক্ষম।”

হোয়াইট সস পাস্তা থেকে চিকেন সসেজ পিৎজা, আমেরিকান প্ল্যাটার থেকে মশলা চা, ম্যাগি, চিকেন উইংস, শেক, বিভিন্ন কফি— রেস্তরাঁর মেনু বেশ সমৃদ্ধ। স্বাদে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া না থাকলেও, খাবারে মিশে আছে আন্তরিকতা ও আত্মবিশ্বাস।

আরও অন্যান্য খবর