তৃণমূল সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে যেমন বড়সড় পালাবদলের ছবি সামনে এসেছে, তেমনই তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে টলিউড এবং সাংস্কৃতিক মহলেও। বঙ্গ রাজনীতিতে পদ্মফুলের উত্থানের পর থেকেই একের পর এক অভিনেতা, পরিচালক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক অবস্থান বদল কিংবা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর খবর উঠে আসছে। কেউ প্রকাশ্যে দলবদল করছেন, কেউ আবার চুপিসারে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন রাজনৈতিক ময়দান থেকে। আর এই আবহেই বারাকপুরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা জনপ্রিয় পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা ঘিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। রাজনৈতিক মহল থেকে টলিপাড়া, সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন, পরাজয়ের পরই কেন এই সিদ্ধান্ত?
বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানার কথা ঘোষণা করেন রাজ চক্রবর্তী। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী হয়ে বারাকপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। পাঁচ বছরের বিধায়ক জীবনে এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করলেও ছাব্বিশের নির্বাচনে পদ্ম ঝড়ে টিকতে পারেননি। পরাজয়ের পরই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজ। আর সেই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
এই প্রসঙ্গেই নাম না করেই রাজ চক্রবর্তীকে তীব্র কটাক্ষ করলেন পরিচালক ও নাট্যব্যক্তিত্ব সৌরভ পালোধি, সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “হেরে গেলে রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যায়? এদেরকে বেসিক কোনও রাজনৈতিক শিক্ষার বই উপহার দেওয়া যায় না?” যদিও কোথাও সরাসরি রাজের নাম উল্লেখ করেননি তিনি, তবুও রাজনৈতিক মহল এবং নেটিজেনদের একাংশের মতে, তাঁর এই মন্তব্য স্পষ্টভাবেই রাজ চক্রবর্তীকে উদ্দেশ্য করেই করা।
প্রসঙ্গত, সৌরভ পালোধি বরাবরই স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক মতাদর্শ হোক কিংবা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের নানা বিতর্ক নিজের অবস্থান প্রকাশ্যে জানাতে কখনও পিছপা হন না তিনি। টলিপাড়ার বামপন্থী মুখ হিসেবেও তাঁর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ছাব্বিশের নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপির উত্থান হলেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি সৌরভ। ফল ঘোষণার পরই সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, “২০০৬ তেও ছিলাম, ২০২৬ এও আছি এবং থাকব।” একইসঙ্গে তিনি সুদীপ্ত, মইদুল, আনিস এবং তামান্নার নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, ক্ষমতা বদলালেও তিনি নিজের আদর্শ বদলাতে নারাজ।
সেই কারণেই অনেকের মতে, রাজ চক্রবর্তীর এই দ্রুত রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না সৌরভ। কারণ, তাঁর মতে রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার জায়গা নয়, বরং মতাদর্শ ও লড়াইয়ের জায়গা। হার-জিত রাজনীতির অঙ্গ হলেও পরাজয়ের পর মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়াকে তিনি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাব হিসেবেই দেখছেন বলে মনে করছে একাংশ।
অন্যদিকে রাজ চক্রবর্তীর অনুরাগী এবং তৃণমূল সমর্থকদের একাংশ অবশ্য তাঁর সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত বলেই মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পর কোনও ব্যক্তি যদি নিজের মতো করে জীবনের নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান, তাহলে তা নিয়ে কটাক্ষ করা ঠিক নয়। অনেকেই আবার মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদলের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী মহলের উপরও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলের পর যেভাবে টলিউডের বহু পরিচিত মুখকে নিশানায় নেওয়া হচ্ছে, তাতে অনেকেই হয়তো সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।
আরও পড়ুনঃ “ঘৃণা ছড়ানো কথাও গু’লির মতো ভয়ঙ্কর…এই সময়টা খুব বিপজ্জনক” ভোট পরবর্তী বাংলায় একের পর এক রক্তা’ক্ত ঘটনা! চন্দ্রনাথ রথের হ’ত্যার পর ক্ষুব্ধ ঋদ্ধি সেন! দিলেন সংযমের বার্তা?
তবে এই ঘটনার পর একটা বিষয় স্পষ্ট বাংলার রাজনীতির পালাবদল শুধু প্রশাসনিক স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, তার ঢেউ পৌঁছে গিয়েছে বিনোদন জগতেও। একসময় যাঁরা রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। কেউ সরাসরি সরে যাচ্ছেন, কেউ আবার চুপ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আর সেই আবহেই রাজ চক্রবর্তীর রাজনীতি ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং সৌরভ পালোধির কটাক্ষ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এখন দেখার, আগামী দিনে টলিপাড়ার আরও কত পরিচিত মুখ রাজনৈতিক ময়দান থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন, আর কতজন আবার নতুন লড়াইয়ের বার্তা দেন।






