পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলের টানাপোড়েন নিয়ে জল্পনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের ভিতরে একের পর এক অসন্তোষের প্রকাশ রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঠিক এই আবহেই সামনে এলেন ফিরহাদ হাকিমের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম। একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি এমন কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যা ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পোস্ট শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিরই প্রতিফলন হতে পারে।
প্রিয়দর্শিনী হাকিম তাঁর ফেসবুক পোস্টে সরাসরি কারও নাম না নিলেও মহাভারত ও রামায়ণের প্রসঙ্গ টেনে এমন কিছু উপমা ব্যবহার করেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। তিনি লেখেন, “দুটি মহাকাব্য, একটি শিক্ষা। যখন আনুগত্য বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দেয়, তখন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।” এই বক্তব্যের সঙ্গে ‘ধৃতরাষ্ট্র’ এবং ‘দুর্যোধন’-এর প্রসঙ্গ জুড়ে যাওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, তাঁর নিশানায় ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “চোখে ঠুলি বেঁধে থেকো না, কান দিয়ে দেখো না,” যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রিয়দর্শিনীর এই মন্তব্য কার্যত তৃণমূলের পরিবারতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর ইঙ্গিত, ব্যক্তিগত দুর্বলতা এবং পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণেই বড় বড় রাজনৈতিক শক্তির পতন হয়েছে ইতিহাসে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রিয়দর্শিনীকে দীর্ঘদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বেও তাঁকে সক্রিয়ভাবে দেখা গিয়েছে। ফলে তাঁর এই পোস্টকে সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছেন না অনেকেই।
এই ঘটনার আগে থেকেই তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলছিল। দলের একাধিক মুখপাত্র প্রকাশ্যে নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন এবং সেই কারণেই সম্প্রতি পাঁচ নেতাকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ফিরহাদ হাকিমের পরিবারের সদস্যের এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই দলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, অতীতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি এবং বয়সসীমা নির্ধারণের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হয়েছিলেন ফিরহাদ হাকিম। সেই পুরনো মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে এই নতুন ঘটনা রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ “উন্নয়নের পাঁচালী” থেকে পদ্মশপথের রবীন্দ্রসঙ্গীত? ‘দিদির কথা ফেলতে পারব না’ বলেছিলেন, এবার কার কথা রাখবেন ইমন চক্রবর্তী? আগামীকাল ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণে গায়িকার সম্ভাব্য উপস্থিতি ঘিরে তুমুল চর্চা নেটপাড়ায়! প্রশ্ন উঠছে, এবার কি গেরুয়া বন্দনায় দেবেন মন?
তবে এই পুরো ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি শুধুই ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ, নাকি দলের ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই ধরনের প্রকাশ্য মতবিরোধ বাড়তে থাকে, তবে তা আগামী দিনে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তির উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার, দলীয় নেতৃত্ব এই বিতর্ককে কীভাবে সামাল দেয় এবং প্রিয়দর্শিনীর এই বার্তার রাজনৈতিক অভিঘাত কতদূর গড়ায়।






