৩ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানায়কের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতার নন্দন, শিশির মঞ্চ এবং আরও কয়েকটি জায়গায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই চার দিনের উদযাপনের শেষ দিনের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন রেগো বি, যিনি কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী বাপ্পি লাহিড়ীর নাতি। তবে তাঁর সেই পরিবেশনা দর্শকদের একাংশের মন জয় করতে পারেনি বলেই দাবি উঠে এসেছে সামাজিক মাধ্যমে। গান শেষ হওয়ার পর থেকেই রেগোর কণ্ঠ, পরিবেশনা এবং তাঁর সংগীত দক্ষতা নিয়ে শুরু হয় নানা মন্তব্য ও সমালোচনা। রেগো বি নতুন প্রজন্মের শিল্পী এবং ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত।
এর আগে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তাঁকে বিভিন্ন ভাষায় গান গাইতে দেখা গিয়েছিল এবং সংগীত নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথাও সামনে এসেছিল। বাপ্পি লাহিড়ীর পরিবারের সংগীতের ঐতিহ্যও তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। দাদুর মতোই চোখে চশমা, গলায় সোনার চেন এবং আলাদা স্টাইলের জন্য আগেও তাঁকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁর গান শোনার পর সেই পরিচয়ই যেন নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। অনেকের বক্তব্য, বাপ্পি লাহিড়ীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীর উত্তরসূরি হওয়ায় রেগোর কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা বেশি। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই এবার তাঁর গান নিয়ে দর্শকদের একাংশের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
এক নেটিজেন লিখেছেন, ‘রেগো নাকি হেগো? আগে গান শেখো বাবু তারপর নিজেই বুঝতে পারবে তোমার থেকে গান কতো দুরে সরে ছিল!’ আরও এক জন লিখেছেন, ‘দাদু যদি কাশ্মীরি উল হয়, নাতি হচ্ছে বগলের চু*ল!’ ওই মন্তব্যেই বাপ্পি লাহিড়ীর তৈরি করা ইমেজ এবং তাঁর নাতির বর্তমান পরিচয় নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে। সেই নেটিজেনের দাবি, দাদু বহু বছরের সংগ্রামের পর নিজের আলাদা পরিচয়, পোশাক এবং সোনার গয়নার মাধ্যমে যে ইমেজ তৈরি করেছিলেন, রেগো যেন সেই জায়গায় পৌঁছনোর আগেই লাইমলাইটে চলে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘দাদুর স্ট্রাগল তার ১% করে লাইমলাইট এ আসার কথা ভেবো, এভাবে হয়না, বাপিলাহিরি একটাই, তার আদল বজায় রাখতে গেলেও যোগ্যতা দরকার।’
অর্থাৎ শুধু বিখ্যাত পরিবারের উত্তরসূরি হওয়া নয়, নিজের যোগ্যতায় সেই জায়গা তৈরি করার কথাই তুলে ধরেছেন ওই সমালোচক। তবে এই মন্তব্যগুলির ভাষা যে যথেষ্ট কড়া এবং ব্যক্তিগত, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। রেগোর গান নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে আরও একজন নেটিজেন নিজের গানের দক্ষতার সঙ্গে তুলনা টেনে বলেন, তাঁকে কেউ ‘আপনি গেয়ে দেখান’ বললেও তিনি এমন গান কোনও প্র্যাকটিস ছাড়াই গেয়ে দিতে পারবেন। তাঁর দাবি, স্টেজ দেওয়া হলে তিনি কোনও অটো টিউনের সাহায্য ছাড়াই খালি গলায় গানটি গেয়ে দেখাতে পারবেন। অবশ্য সামাজিক মাধ্যমের এমন মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করার কোনও সুযোগ নেই এবং এগুলি মূলত ব্যক্তিগত শ্রোতাদের মতামত।
তবু এই মন্তব্যগুলি থেকেই বোঝা যাচ্ছে, উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের মতো বিশেষ একটি অনুষ্ঠানে রেগোর পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একদিকে বাপ্পি লাহিড়ীর নাতি হিসেবে রেগোর প্রতি আগ্রহ রয়েছে, অন্যদিকে সেই পরিচয়ের কারণেই তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশার মাত্রাও অনেক বেশি। বাপ্পি লাহিড়ী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অসংখ্য জনপ্রিয় গান ও নিজস্ব স্টাইলের মাধ্যমে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন। ফলে তাঁর উত্তরসূরিকে ঘিরে তুলনা যে উঠবে, সেটাও নতুন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেগোর নিজের সংগীত পরিচয় তিনি কীভাবে তৈরি করেন, সেটাই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের চার দিনের আয়োজনে সিনেমা প্রদর্শনী, আলোচনা, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সংগীত পরিবেশনাও ছিল।
আরও পড়ুনঃ নেই পর্দায় উপস্থিতি! কিন্তু দুই ছবির নেপথ্যেই ছিলেন আয়েশা! জনপ্রিয় সিনেমা নিয়ে অজানা কথা জানালেন অভিনেত্রী
মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে এমন একটি মঞ্চে রেগোর গান তাই স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছিল। তবে প্রশংসার বদলে এবার সামাজিক মাধ্যমের একটি অংশের কড়া সমালোচনাই বেশি আলোচনায় এসেছে। কেউ তাঁর গানের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ আবার সরাসরি বাপ্পি লাহিড়ীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, একজন তরুণ শিল্পীকে শুধুমাত্র পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কিংবদন্তি দাদুর সঙ্গে মেলানোও কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। রেগোর সংগীত সফর এখনও শুরুর দিকেই, তাই সময়ের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব গায়কী ও পরিচয় কতটা তৈরি হয়, সেটাই দেখার। এই মুহূর্তে অবশ্য উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের মঞ্চে তাঁর সেই গানই সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কের নতুন বিষয় হয়ে উঠেছে। মহানায়কের শতবর্ষের এই বিশেষ আয়োজনের শেষ দিনে যে পরিবেশনা এতটা আলোচনার জন্ম দেবে, তা বোধহয় রেগোর কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল।






