নিট-দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের আঁচ এবার এসে পৌঁছাল কলকাতার রাজপথে। শুক্রবার শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আয়োজিত ছাত্র মিছিল ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতেই এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আন্দোলনের নামে রাজপথ অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে হওয়া আন্দোলন কি আদৌ অহিংস ও গণতান্ত্রিক পথে এগোচ্ছে, নাকি তা ক্রমশ বিশৃঙ্খলার রূপ নিচ্ছে সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচির সমর্থনে কলকাতায় আয়োজিত এই মিছিলে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র সদস্যদের পাশাপাশি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এসএফআই, এআইডিএসও-সহ একাধিক বাম ছাত্র সংগঠন মিছিলের পাশে দাঁড়ায়। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতেই তাঁরা পথে নেমেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকেও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কথা উঠে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির আন্দোলনে রাজনৈতিক মেরুকরণ কতটা যুক্তিযুক্ত এবং তার প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে।
তবে ধর্মতলায় মিছিল পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ডোরিনা ক্রসিং এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায়। পাল্টা অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে জুতো, জলের বোতল এবং অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপরেও হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মতলা কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। আন্দোলনের নামে পুলিশের উপর হামলা এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সমাজমাধ্যমেও বহু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, যদি এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার হয়, তাহলে কেন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হবে এবং কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হবে?
আরও একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সরকারি সম্পত্তি এবং দেশের সম্পদের সুরক্ষাকে ঘিরে। সমালোচকদের দাবি, গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন সংবিধান স্বীকৃত, তেমনই সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা বা পুলিশের উপর আক্রমণ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়, তাহলে তার দায় কে নেবে সেই প্রশ্নও উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, ছাত্র আন্দোলনের নৈতিক অবস্থান তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন তা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং সাংবিধানিক পথে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশি বাধা এবং বলপ্রয়োগের ফলেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। ফলে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের দাবিও উঠতে শুরু করেছে।
এদিকে সমাজমাধ্যমে আন্দোলনকে ঘিরে একাধিক দাবি এবং পাল্টা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের ভূমিকা, বাইরের শক্তির মদত কিংবা আন্দোলনের পিছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মতো নানা জল্পনাও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার দাবিতে হওয়া আন্দোলন যদি রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হিংসা এবং সম্পত্তি নষ্টের ঘটনায় পরিণত হয়, তাহলে মূল ইস্যু আড়ালে চলে যেতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল নিট দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন কি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি রাজপথের সংঘর্ষই হয়ে উঠবে এই আন্দোলনের নতুন পরিচয়?






