২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে আত্মসমালোচনা, ক্ষোভ এবং নানা জল্পনা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তুঙ্গে। নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর দলের একাধিক নেতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই আবহেই তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং দীর্ঘদিনের সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধা দেবাংশু ভট্টাচার্যকে দলের আইটি সেলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপাসনা চৌধুরীকে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যেমন রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে, তেমনই দেবাংশুর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে একাধিক জল্পনা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দেবাংশু ভট্টাচার্য নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, তাঁকে সরিয়ে দেওয়াকে শাস্তি হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। তাঁর দাবি, ২০২২ সাল থেকে তিনি দলের আইটি সেলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন এবং গত কয়েক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগঠনের কাজ করেছেন। তাঁর মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর নতুনদের সুযোগ দেওয়াও জরুরি। যাঁকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁকেও তিনি নিজের তৈরি কর্মী বলেই উল্লেখ করেন। দেবাংশুর কথায়, দীর্ঘ সাত বছর ধরে বিরামহীন রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধুদের জন্য সময় বের করা সম্ভব হয়নি। তাই নির্বাচনের পর কিছুটা সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবনের জন্য রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। দলের সক্রিয় সাংগঠনিক কাজ থেকে সাময়িক দূরে থাকলেও তিনি এখনও নিজেকে তৃণমূলের কর্মী হিসেবেই দেখছেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
আরও পড়ুন: “আপত্তি মমতাকে নয়, অভিষেককে নিয়েই” বিদ্রো’হী তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানের স্পষ্ট বার্তা! অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরানোর শর্তেই কি মমতার সঙ্গে সমঝোতা?
তবে বিতর্কের সূত্রপাত হয় তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। অনেকের দাবি ছিল, ওই পোস্টে তিনি দলের পরাজয় এবং নেতৃত্বের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। যদিও দেবাংশু সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনও দলের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি। বরং দলের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া এবং অন্ধভাবে বিশ্বাস করার প্রবণতার সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, সংগঠনের ৯০ শতাংশ সিদ্ধান্ত বা দায়িত্ব কয়েকজন নির্দিষ্ট মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বহু অভিজ্ঞ নেতা ও কর্মী উপেক্ষিত হয়েছেন। এই বক্তব্যে তিনি এখনও অনড় বলেও জানিয়েছেন। দেবাংশুর দাবি, এই মতামত শুধু তাঁর একার নয়, দলের বহু কর্মী ও নেতার মধ্যেও একই ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, অতীতে যাঁদের জন্য একাধিক পুরনো ও পরীক্ষিত নেতাকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে চলে গিয়েছেন বা দলীয় অবস্থান বদলেছেন। ফলে সেই সিদ্ধান্তগুলির রাজনৈতিক মূল্য আজ তৃণমূলকে দিতে হচ্ছে বলেই তাঁর মত।
সাক্ষাৎকারে দেবাংশু একাধিক উদাহরণও টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্য, কিছু নেতার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে দলের বহু অভিজ্ঞ মুখকে কার্যত কোণঠাসা করা হয়েছিল। অথচ পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্তগুলির সুফল দল পায়নি। তিনি মনে করেন, যদি সেই সময় পুরনো নেতৃত্বকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, তাহলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত। যদিও তিনি কারও নাম সরাসরি উল্লেখ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি, তবুও তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর ‘ভুলভাল লোককে বিশ্বাস’ করার মন্তব্য নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এই মন্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য খুঁজতে শুরু করেছেন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। যদিও দেবাংশু বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর বক্তব্য দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং সংগঠনের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করার স্বার্থেই তিনি এই আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সবশেষে সবচেয়ে বড় জল্পনার বিষয় ছিল তাঁর দলবদল। সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে বিজেপিতে যোগদানের গুঞ্জন ছড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে দেবাংশুকেও একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তবে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তৃণমূল ছেড়ে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার কথা তিনি ভাবছেন না। তাঁর কথায়, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, আর সেই আদর্শের সঙ্গেই তিনি যুক্ত রয়েছেন। ‘ভালো তৃণমূল’ বা ‘খারাপ তৃণমূল’ এই ধরনের কোনও বিভাজনে তিনি বিশ্বাস করেন না বলেও মন্তব্য করেন। ফলে রাজনৈতিক জল্পনা যতই বাড়ুক, আপাতত দলবদলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন দেবাংশু। তবে তাঁর মন্তব্য যে তৃণমূলের অন্দরের অসন্তোষ এবং আত্মসমালোচনার বিতর্ককে আরও উসকে দিল, তা বলাই বাহুল্য।






