অমর্ত্যের রহস্যমৃ*ত্যু, আরজি কর থেকে জমি দখল ও চাকরি বঞ্চ*না, তৃণমূল আমলে কি বিচার না পেয়েই চাপা পড়েছিল এত অভিযোগ? জনতার দরবারে এবার আর কী কী বি*স্ফোরক দাবি নিয়ে সামনে আসছেন সাধারণ মানুষ?

পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে একের পর এক দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, তোলাবাজি, জমি দখল, প্রশাসনিক অবহেলা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য পরিষেবা, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, সরকারি প্রকল্পের টাকা বণ্টন নানা ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরব ছিলেন সাধারণ মানুষ। রাজ্যের বহু পরিবার দাবি করেছে যে তারা বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও সঠিক বিচার পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের রক্ষা করার চেষ্টা হয়েছে। ফলে রাজ্যের একাংশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ এবং বঞ্চনার অনুভূতি ক্রমশ বেড়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় আদালতের হস্তক্ষেপ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্ত এবং প্রকাশ্যে আসা নথিপত্রের ফলে অতীতের বহু অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বহু মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও বঞ্চনার কথা সরাসরি সরকারের কাছে তুলে ধরার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।

জনতার দরবারে সেই সুযোগ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষ যাতে কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি সরকারের কাছে নিজেদের সমস্যা জানাতে পারেন, তার জন্য নিয়মিত ‘জনতার দরবার’ অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে এই কর্মসূচির চার সপ্তাহ পার হয়েছে। এর মধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের অভিযোগ, দুর্ভোগ এবং বিচার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। প্রত্যেক সপ্তাহে অভিযোগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। কেউ চাকরি সংক্রান্ত বঞ্চনার কথা বলছেন, কেউ জমি দখলের অভিযোগ তুলছেন, আবার কেউ বহু পুরনো অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। ফলে জনতার দরবার এখন কার্যত রাজ্যের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অভিযোগ জানানোর অন্যতম বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

এই দরবারে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলির মধ্যে অন্যতম বর্ধমান ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের জুনিয়র ডেন্টাল সার্জন তথা ডেন্টাল ছাত্র অমর্ত্যের মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালের ১০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়েছিল এবং তখন ঘটনাটিকে পথ দুর্ঘটনা বলে জানানো হয়। কিন্তু অমর্ত্যের মা-র দাবি, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁদের অভিযোগ, অমর্ত্য অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলতেন এবং গাড়ি চালানোর সময় ফুল-ফেস হেলমেট, মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতেন। তাই সাধারণ দুর্ঘটনায় তাঁর এমন মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক নয়। পরিবারের দাবি, গাড়িতেও তেমন কোনো ক্ষতির চিহ্ন ছিল না। আরও গুরুতর অভিযোগ করে অমর্ত্যের মা জানান, তাঁর ছেলের মাথার একটি নির্দিষ্ট অংশে ধারালো বা সুচালো কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। ছবি দেখিয়ে তাঁরা দাবি করেছেন যে সেই আঘাত দুর্ঘটনার ফলে হওয়া সম্ভব নয়। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনার সঠিক তদন্ত না করে দ্রুত ফাইল বন্ধ করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। দীর্ঘ দুই বছর পরও প্রকৃত সত্য সামনে না আসায় অবশেষে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে এসে নতুন করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

জনতার দরবারে উঠে এসেছে আরও এক হৃদয়বিদারক অভিযোগ। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আয়ুষ নাথের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৩ মে স্কুলে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর শিশুটির মৃত্যু হয়। তবে পরিবারের দাবি, ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, শিশুটির মৃতদেহ এবং স্কুলব্যাগ থেকে কাদা-বালি ও অন্যান্য চিহ্ন মুছে ফেলতে বালতি বালতি জল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছিল। পরিবারের মতে, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একইসঙ্গে আরজি কর হাসপাতালের বহুল আলোচিত অভয়া কাণ্ড এবং কামদুনি ঘটনার মতো পুরনো মামলাগুলির ক্ষেত্রেও নতুন করে তদন্তের দাবি নিয়ে বহু মানুষ জনতার দরবারে উপস্থিত হচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, অতীতে বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এবং প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে তোলাবাজি, জমি দখল এবং প্রোমোটিং সিন্ডিকেটের বিষয়ও। ভবানীপুরের প্রবীণ নাগরিক প্রবীর মুখোপাধ্যায় জনতার দরবারে এসে অভিযোগ করেন যে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রোমোটিং করতে গিয়ে তিনি একটি প্রভাবশালী তোলাবাজ চক্রের অত্যাচারের শিকার হন। তাঁর দাবি, স্থানীয় সিন্ডিকেটের চাপে তিনি কার্যত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন এবং নিজের জমির অধিকারও হারিয়েছেন। একইসঙ্গে বহু এসএসসি চাকরিপ্রার্থী দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগ নিয়ে হাজির হন। তাঁদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতির কারণে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলার শ্রমিকরাও ১০০ দিনের কাজের বকেয়া মজুরি এবং পঞ্চায়েত স্তরের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তাঁদের দাবি, কাজ করেও সময়মতো প্রাপ্য টাকা পাননি এবং বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো সমাধান হয়নি।

আরও পড়ুনঃ ভবানী ভবনে হাজিরার পরই কালীঘাটে CID-র হানা, বাড়ির বাইরে ত’দন্তকারীরা আর ভিতরে আইনি পরামর্শ! রক্ষাকবচের আড়ালেও কি নতুন মামলায় ‘ভাইপো’কে ঘিরে বাড়ছে গ্রেফ*তারির জল্পনা?

স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সমস্যাও জনতার দরবারে বড় আকারে সামনে এসেছে। মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালের চুক্তিভিত্তিক নার্সদের প্রতিনিধি অমিতা রায় অভিযোগ করেন, ২০১৯ সালের পর থেকে সেখানে কোনো স্থায়ী নিয়োগ হয়নি। তাঁর দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তাঁরা স্থায়ী নার্সদের মতোই একই দায়িত্ব পালন করলেও বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকারের ‘সমকাজে সমবেতন’ নীতি বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি বলেও অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে জনতার দরবারে জমা পড়া অভিযোগগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মানুষ এখনও নিজেদের সমস্যার সমাধান ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, এই অভিযোগগুলির কতগুলি তদন্তের পর্যায়ে যায় এবং কত দ্রুত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর