১৫ বছরের ক্ষমতা হারিয়েই এবার বাম-অতিবামদের হাত ধরতে চাইছেন মমতা! “ক্ষমতা থাকাকালীন বামেদের আক্রমণ, আর ক্ষমতা যেতেই ‘বিজেপি রুখতে ঐক্য’র ডাক” CPIML-এর কড়া বার্তা!

১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবসান ঘটিয়ে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। শনিবার, ১০ মে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাজ্যে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আলোচনা। আর সেই আবহেই বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ডাক দিলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তাঁর সেই প্রস্তাব ঘিরেই এবার সরাসরি কড়া বার্তা দিল সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন। দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁরা আগেই রাস্তায় নেমেছেন, এবার মমতাকেও রাস্তায় নামতে হবে।

শনিবার রবীন্দ্রজয়ন্তীর একটি অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির উদ্দেশে আবেদন জানান, বিজেপিকে রুখতে হলে সব বিরোধী শক্তিকে একজোট হতে হবে। তিনি বলেন, “লেফটিস্ট হোক, আল্ট্রা-লেফট হোক, জাতীয় দল হোক, আমার কোনও ইগো নেই। সবাইকে নিয়েই চলতে চাই।” এমনকী রাজনৈতিক দলগুলিকে আলোচনার জন্য সময়ও বেঁধে দেন তিনি। জানান, বিকেল চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত তিনি অফিসে থাকবেন, কেউ কথা বলতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন। রাজনৈতিক মহলে এই বার্তাকে অনেকেই মমতার নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন। কারণ ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তৃণমূল নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, একক শক্তিতে বিজেপির মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।

তবে মমতার এই প্রস্তাবের জবাব দিতে বেশি সময় নেয়নি সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন। দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, “গোটা দেশজুড়ে বিজেপি বিরোধী একটা বড় প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, ইন্ডিয়া জোট। সেখানে কংগ্রেস, তৃণমূল, বামপন্থী সবাই রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সন্ত্রাস ও হিংসার বিরুদ্ধে আমরা প্রথম দিন থেকেই রাস্তায় আন্দোলন করছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও রাস্তায় নামুন। রাস্তাতেই সব বিরোধীদের দেখা হবে।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, সিপিআই (এম-এল) নেতৃত্ব এখনই কোনও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোটে আগ্রহী নয়। বরং তাঁরা আন্দোলনের রাজনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মধ্যে যেমন বিজেপি বিরোধিতার বার্তা রয়েছে, তেমনই রয়েছে তৃণমূলের প্রতি দূরত্ব বজায় রাখার ইঙ্গিতও।

আরও পড়ুন: “শিল্পীদের দাঁড় করালেই ভোট আসে না!” হারের পর তৃণমূলের প্রচার কৌশল নিয়েই প্রশ্ন তুললেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়! টলিউডের বদলে যাওয়া পরিবেশ নিয়ে কী বললেন তিনি?

অন্যদিকে মমতার প্রস্তাব একেবারে খারিজ করে দিয়েছে সিপিআইএম। দলের নেতা সুজন চক্রবর্তী শনিবারই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, বাংলায় বিজেপির উত্থানের জন্য অনেকটাই দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁর অভিযোগ, একসময় বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধারাবাহিক অবস্থান নেননি। ফলে এখন বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দিলেও মানুষের কাছে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। সুজনের কথায়, “বিজেপি ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী শক্তি, এটা মানুষ বুঝতে পারছেন। বামপন্থীরা মানুষকে সঙ্গে নিয়েই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কি সেই বিশ্বাসযোগ্যতা আছে? তাঁর দলের বহু নেতাই তো এখন বিজেপিতে।” এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বাংলায় সরকার পরিবর্তনের পর বিরোধী রাজনীতির ভিতও দ্রুত বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছিল, বিজেপি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পর বিজেপির বিরুদ্ধেও রাজ্যের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে শুরু করেছে বলে দাবি বিরোধী শিবিরের। সেই কারণেই এখন বিরোধী ঐক্যের প্রশ্ন সামনে আসছে। তবে বাস্তবে সেই ঐক্য কতটা সম্ভব, তা নিয়েই রয়েছে বড় প্রশ্ন। কারণ বাম দলগুলির একাংশ এখনও তৃণমূলকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখে। ফলে বিজেপি বিরোধিতার মঞ্চে সবাই একসঙ্গে এলেও রাজনৈতিকভাবে একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেউই।

আরও পড়ুন:  “সেলিব্রিটি বলেই ক্ষমতার দাপট নয়, এবার থেকে সবার জন্য সমান অধিকার” নৈহাটির বড় মায়ের মন্দিরে ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধের ঘোষণা, বিজেপি বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের!

সবমিলিয়ে, বাংলার নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ক্ষমতা হারানোর পর তিনি যে আবারও বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন, তা স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর সেই ডাককে কতটা গুরুত্ব দেবে বাম ও অতিবাম শক্তি, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আপাতত সিপিআই (এম-এল) আন্দোলনের পথে থাকার বার্তা দিয়েছে, আর সিপিআইএম সরাসরি ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট গঠনের রাস্তা যে এত সহজ নয়, তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল বাংলার রাজনীতিতে।

RELATED Articles