যাঁরা একদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, তাঁরাই আজ পথে। পেছনে পড়ে রইল বহুদিনের পড়াশোনা, ট্রেনিং, স্বপ্ন—সব মিলিয়ে জীবনের দীর্ঘ এক প্রস্তুতি। একসময় যাঁদের নাম সরকারি নিয়োগপত্রে ছিল, আজ তাঁদের ঘিরেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। স্কুলের দরজায় যাঁরা প্রবেশ করেছিলেন শিক্ষক হয়ে, আজ তাঁদের অনেকেই ঘুরছেন কাজ আর পরিচয়ের খোঁজে।
ঘরের ভেতরে অভাবের চাপ, বাইরের জগতে ‘অযোগ্য’ তকমা—এই দুইয়ের মাঝখানে পিষে যাচ্ছেন বহু তরুণ-তরুণী। যাঁদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ আজও নেই, অথচ তাঁদের স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। দিনের পর দিন বেতন ছাড়াই সংসার চালাতে হচ্ছে তাঁদের। পরিবারের মানুষগুলো প্রথমে পাশে দাঁড়ালেও এখন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—”তাহলে কি ভুল করেই পড়াশোনা করেছিলে?” এমনই হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে বুধবার সকালে হাজরা মোড়ের পথ ধরে হাঁটলেন একদল প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকা।
বিক্ষোভ শুরু হয় সকাল থেকেই। মূলত ১৮০৩ জন ‘নট স্পেসিফিক্যালি টেন্টেড’ প্রার্থীদের মধ্যে একাংশ হাজির হন কালীঘাটের অদূরে হাজরা মোড়ে। তাঁদের দাবি, তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত নন। একজন আন্দোলনকারী বললেন, “আমি স্কুলে গিয়েছিলাম, ক্লাস নিয়েছি। অথচ আজ বেতন বন্ধ, স্কুলেও ঢুকতে দিচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন সব ঠিক আছে, কিন্তু আমরা জানাতে এসেছি—সব ঠিক নেই।” তাঁদের গলায় স্পষ্ট অভিমান, মুখে ক্ষোভ আর চোখে হতাশা।
বিক্ষোভ যতই জমাট বাঁধছিল, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ততই বাড়ছিল নজরদারি। পুলিশ দ্রুত মোতায়েন হয় ঘটনাস্থলে। একসময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিক্ষোভকারীদের আটক করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। রাস্তায় ধাক্কাধাক্কি, স্লোগান—চেনা কলকাতা যেন মুহূর্তেই পাল্টে যায়। এই ঘটনাকে ঘিরে নানা মহলে শুরু হয় বিতর্ক। কারও মতে, প্রশাসনের ভূমিকা অনায্য, আবার কারও মতে, আইন-শৃঙ্খলার প্রয়োজনে এমন পদক্ষেপ জরুরি ছিল।
আরও পড়ুনঃ App bike : রোজকার যাত্রা বদলে গেল দুঃস্বপ্নে! অ্যাপ বাইকে একাকী মহিলা যাত্রীর উপর চরম নির্যাতন!
মূল সমস্যা শুরু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ঘিরে। সেই নির্দেশ মেনে স্কুল শিক্ষা দফতর ‘যোগ্য’ প্রার্থীদের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে পাঠিয়েছে জেলা শিক্ষা দফতরে। সেই তালিকার ভিত্তিতে অনেককে আবার স্কুলে ডেকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যাঁদের নাম নেই সেই তালিকায়, তাঁরা নিজেদের ‘নট স্পেসিফিক্যালি টেন্টেড’ বলেই দাবি করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ওএমআর বা অন্য কোনও দুর্নীতির অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অথচ তাঁদের কাজ ও বেতনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এদিনের প্রতিবাদ সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই এক হাহাকার—কেবল চাকরির নয়, আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই।





