একটা ইউপিআই পেমেন্টেই যেন খুলতে শুরু করেছে গোটা খুনের রহস্যের জট। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ খুনের তদন্তে এবার সবচেয়ে বড় সূত্র হয়ে উঠেছে বালি টোলপ্লাজার একটি ডিজিটাল লেনদেন। মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় প্রথম থেকেই পরিকল্পিত হামলার গন্ধ পেয়েছিলেন তদন্তকারীরা। কিন্তু কোনও নির্ভরযোগ্য সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীর অভাবে তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছিল। সেই পরিস্থিতিতেই টোলপ্লাজায় ইউপিআইয়ের মাধ্যমে দেওয়া একটি পেমেন্ট যেন গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছে বড়সড় ক্লু। সেই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ধরেই এখন একের পর এক তথ্য উঠে আসছে পুলিশের হাতে।
তদন্তকারীদের দাবি, খুনের দিন ব্যবহৃত নিসান মাইক্রা গাড়িটি বালি টোলপ্লাজা পার হয়েছিল। সেখানে টোলের টাকা নগদে না দিয়ে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে মেটানো হয়। আর সেই লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই পুলিশের হাতে আসে এক অভিযুক্তের মোবাইল নম্বর ও পরিচয়। শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট নয়, টোলপ্লাজার সিসিটিভি ফুটেজেও ধরা পড়ে গাড়ির ছবি এবং তার মধ্যে থাকা কয়েকজন ব্যক্তির উপস্থিতি। তদন্তকারীদের মতে, এই দুটি সূত্র একসঙ্গে মেলাতেই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত প্রতীক সরিয়ে সামনে আনা হল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে, এ কি শুধুই উইকিপিডিয়া এডিট নাকি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু হতে চলেছে নতুন অধ্যায়?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, খুনে ব্যবহৃত গাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের নয়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ঝাড়খণ্ড থেকে গাড়িটি নিয়ে আসা হয়েছিল। গোটা অপারেশনটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে চালানো হয়েছে বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা। তদন্তকারীদের ধারণা, পেশাদার শ্যুটারদের দিয়েই এই হামলা করানো হয়েছে। ডিজিটাল সূত্র বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করার পর ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে পৌঁছে গিয়েছে রাজ্য পুলিশের একটি বিশেষ দল। সেখানে গোপন ডেরায় লুকিয়ে থাকা শ্যুটার ও মূল ষড়যন্ত্রকারীদের খোঁজে শুরু হয়েছে চিরুনি তল্লাশি।
ঘটনার পুনর্গঠন করে পুলিশ জানতে পেরেছে, বুধবার রাতে দোহারিয়া এলাকায় চন্দ্রনাথ রথের গাড়ির পথ আটকে আচমকাই গুলি চালানো হয়। হামলার পর আততায়ীরা মোটরবাইকে করে দ্রুত এলাকা ছাড়ে বলে অনুমান তদন্তকারীদের। পেয়ারাবাগান দিকের গলিপথ ব্যবহার করেই তারা পালিয়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। সেই সম্ভাব্য রুট ধরে এখন একাধিক জায়গায় তল্লাশি চলছে। তবে তদন্তের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অচল বা ভুল দিকে ঘোরানো সিসিটিভি ক্যামেরা। বহু জায়গাতেই দীর্ঘদিন ধরে ক্যামেরা অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও আবার ক্যামেরার মুখ রাস্তার বদলে অন্যদিকে ঘোরানো থাকায় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কোনও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়নি।
মাঠপাড়া এলাকা এবং আশপাশের দোকানগুলির সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকেও তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলেনি। কারণ, ঘটনার সময় রাত হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ দোকান বন্ধ ছিল। ফলে ক্যামেরাগুলিও কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিল। তদন্তকারীদের একাংশের অনুমান, আততায়ীরা ইচ্ছাকৃতভাবেই রাতের অন্ধকার নামার অপেক্ষা করেছিল। যাতে বাইকে চেপে দ্রুত পালানোর সময় তাদের মুখ বা বাইকের নম্বরপ্লেট স্পষ্টভাবে ক্যামেরায় ধরা না পড়ে। এই পরিকল্পিত কৌশল থেকেই বোঝা যাচ্ছে, হামলাকারীরা অত্যন্ত পেশাদার এবং আগে থেকেই গোটা এলাকা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিল।
এদিকে তদন্তে নতুন করে রহস্য বাড়িয়েছে একটি লাল রঙের গাড়ি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, বিরাটি মোড় থেকে যশোর রোড ধরে চন্দ্রনাথ রথের স্করপিওর ঠিক পিছনেই চলছিল গাড়িটি। শুধু তাই নয়, দোহারিয়া এলাকায় ঢোকার পরও সেই লাল গাড়িটিকে দেখা যায়। তদন্তকারীদের সন্দেহ, শুরু থেকেই চন্দ্রনাথ রথের গাড়িকে অনুসরণ করছিল সেটি। এখন সেই গাড়ির চালক ও আরোহীদের পরিচয় জানতেই জোর তল্লাশি শুরু হয়েছে। গোয়েন্দাদের মতে, এই লাল গাড়ির রহস্য ভেদ করতে পারলেই চন্দ্রনাথ রথ খুনের পুরো ষড়যন্ত্রের জাল সামনে চলে আসতে পারে।






