স্বদেশি আন্দোলনের নস্টালজিয়া, জানুন তার অজানা গল্প

লাল-হলুদ প্যাকেট, তাতে একটি ছোট্ট শিশু ও দুধের ছবি। কিছু মনে পড়ছে, কীসের কথা বলা হচ্ছে? ঠিকই ধরেছেন, নব্বইয়ের দশকের সকল মানুষরা হয়ত এই বিশেষ প্যাকেটটির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। কখনও দুধে ডুবিয়ে না কখনও আবার চায়ের সহযোগে পার্লে-জি বিস্কুটের জুড়ি মেলা ছিল ভার। এই বিস্কুট যে কীভাবে কখন মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, তা কেউ বলতে পারে না।

কিন্তু কীভাবে বাজারে এল এই বিস্কুট?

ব্রিটিশদের শাসনকালে ক্যান্ডি ও বিস্কুট আমদানি করা হত ব্রিটেন থেকে। দামি সেই বিস্কুট কেনার সাধ্য ছিল না অনেক ভারতীয়রই। এই কারণে ১৯২৯ সালে আমজনতার কথা ভেবে প্রথম বিস্কুট নিয়ে এলেন পার্লে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মোহনলাল দয়াল।

তিনি আদতে ছিলেন একজন রেশম ব্যবসায়ী। স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি এই ব্যবসা শুরু করেন। জার্মানি থেকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ শেষে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ক্যান্ডি মেশিন কিনে দেশে ফেরেন মোহনলাল। মুম্বইয়ের ইরলা ও পারলা নামে দুই গ্রামের মাঝে একটি পুরনো কারখানা কিনে ১২ জন পরিবারের সদস্য নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। আর এই জায়গারই নাম খানিক বদলে কোম্পানির নাম রাখা হয় পার্লে। অরেঞ্জ ক্যান্ডি দিয়ে প্রথম পথ চলা শুরু হয় পার্লের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রমরমিয়ে শুরু হয় তাঁর বিস্কুটের ব্যবসা। অল্প দামে ভালো মানের বিস্কুট বাজারে এনে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিকে জোর টেক্কা দেন তিনি। তবে স্বাধীনতার পর গমের সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় বিস্কুট উৎপাদন। এরপর ফের ১৯৮২ সালে ভারতের বাজারে ফেরে পার্লে, পার্লে গ্লুকো নাম নিয়ে। তবে সেই সময় একাধিক গ্লুকো বিস্কুটে বাজার ছেয়ে গিয়েছে। নিজের স্বতন্ত্র বজায় রাখতে বিস্কুটের নাম বদলে রাখা হয় পার্লে-জি আর ট্যাগলাইন হয়, জি ফর জিনিয়াস।

একাধিক মাইলস্টোন পার করেছে এই বিস্কুট উৎপাদনকারী সংস্থা। ২০০৩ সালে বিশ্বের এক নম্বর বিস্কুট কোম্পানির শিরোপা পায় পার্লে-জি। বাজার সংক্রান্ত গবেষণাকারী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে এই সংস্থার বাজারদর ছিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

মনে করা হয় যে প্রতি ঘণ্টায় এক কোটিরও বেশি পার্লে বিস্কুট খায় ভারতবাসী। ভারতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে স্থান পেয়েছে পার্লে-জি।  ফার্জি ক্যাফের মত অভিজাত রেস্তোরাঁর মেনুতেও রয়েছে পার্লে-জি চিসকেক, পার্লে-জি মিল্কশেক-এর মত নানান রেসিপি।

১৯৩৮ থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত হাইড অ্যান্ড সিক, মোনাকো, ক্র্যাক জ্যাক, ২০-২০ কুকিস, পার্লে মিলানো, নানান স্বাদের বিস্কুট বাজারে নিয়ে এসেছে পার্লে। তবে জিএসটি চালু হতে মন্দার মুখ দেখে এই কোম্পানি। সেই সময় কর্মী ছাঁটাই থেকে শুরু করে ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিস্কুটের প্যাকেটে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া নানান কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় পার্লে কোম্পানি।

তবে অতিমারির সময় একদিকে যখন নানান্ম সংস্থা ক্ষতির মুখ দেখে, সেই সময় পাঁচ শতাংশ মুনাফা বাড়ে পার্লের। পার্লে প্রোডাক্টস-এর অন্যতম শীর্ষকর্তা মায়াঙ্ক শাহ জানান যে এই মুহূর্তে দেশের মোট বিস্কুটের বাজারের প্রায় ৩২ শতাংশ রয়েছে পার্লের দখলে। অতিমারি ফের একবার ভারতবাসীকে তাদের পুরনো নস্টালজিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে যেন সাহায্য করেছে।

আরও অন্যান্য খবর