‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই বিখ্যাত সৃষ্টি নিয়ে চলতি বছর বিশেষভাবে উদযাপন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে গানটিকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছেন, এ রাজ্যে থাকতে হলে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে হবে। অন্যদিকে বামপন্থীদের বক্তব্য, দেশপ্রেম প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম কোনও নির্দিষ্ট গান হতে পারে না। এই বিতর্কের মধ্যেই ফেসবুকে নিজের মত প্রকাশ করে তসলিমা লিখেছেন, তিনি কোনও দ্বিধা ছাড়াই ‘বন্দে মাতরম’ বলেন।
তসলিমা নাসরিন দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় কট্টরপন্থার বিরোধিতা এবং তাঁর বিভিন্ন লেখার কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছেন। বাংলাদেশের জন্ম হলেও নানা পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। পরবর্তীকালে কলকাতাতেও তাঁর থাকা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ সময় বিদেশে কাটানোর পর চলতি মাসের শুরুতে প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় ফেরেন তিনি। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে তাঁর এই সফর হলেও রাজ্য সরকারের সহযোগিতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসে। রবীন্দ্রসদনে তাঁকে নাগরিক সম্মান জানান মুখ্যমন্ত্রী এবং ভবিষ্যতে যখন খুশি কলকাতায় আসার আশ্বাস দেন। তসলিমাও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বের কথা বলেন।
এরপর শনিবার ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন তসলিমা। তিনি জানান, এই গান উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করেন না। বরং এর মধ্যে নিজের ইতিহাস, শিকড় এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি স্বীকৃতি দেখেন। দেশভাগের পরে তাঁর জন্ম হলেও তাঁর বাবা-মা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মানুষ। তাঁর মতে, ১৯৪৭ সালে একটি সীমান্তরেখা মানুষের ভূগোলকে ভাগ করে দিলেও ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং স্মৃতিকে কাঁটাতারের মাধ্যমে আলাদা করা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্যে অবিভক্ত বাংলার সঙ্গে নিজের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক যোগের কথাই উঠে এসেছে।
তসলিমার মতে, বাংলা বহু শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে নিজের আলাদা সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। তবে এই সম্পর্ককে তিনি একতরফা বলে মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য, বাংলা যেমন ভারতীয় সভ্যতা থেকে নানা কিছু গ্রহণ করেছে, তেমনই সাহিত্য, সংগীত, চিন্তাভাবনা, সংস্কার ও প্রতিবাদের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজকেও অনেক কিছু দিয়েছে। তাই বাংলা ও ভারতের সম্পর্ককে তিনি অধীনতার নয়, বরং পারস্পরিক আদানপ্রদানের সম্পর্ক হিসেবে দেখেছেন। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ‘অখণ্ড ভারতমাতা’কে প্রণাম করার অর্থ কোনও রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড রাষ্ট্রের দাবি করা নয়।
আরও পড়ুনঃ ‘উত্তম’ নামেই শুরু, এবার ডাকের খামেও মহানায়ক! শতবর্ষ উপলক্ষে, কলকাতা জিপিওর বিশেষ ডাক-স্মারকে সম্মান বাঙালির আবেগকে! জানেন, উত্তম কুমারকে কে দিয়েছিল এই নাম?
তসলিমা জানিয়েছেন, তাঁর কাছে এই প্রণাম মূলত দেশভাগের আগের সেই সাংস্কৃতিক ভারতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, যার ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর পূর্বপুরুষদের যোগ রয়েছে। তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতিও সেই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে তাঁর এই বক্তব্যে একদিকে যেমন নিজের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনই বহুত্ববাদকেও গুরুত্ব দিয়েছেন লেখিকা। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই তাঁর এই পোস্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।






