২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি সকালে ঢাকার গ্রিন রোডের বাড়ি থেকে শুটিংয়ের উদ্দেশে বের হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর। সকাল ৭টার পর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শুটিং সেটেও পৌঁছাননি তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে খোঁজ শুরু হলেও পরদিন পর্যন্ত তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। ১৭ জানুয়ারি শিমুর বোন ফাতেমা নিশা এবং স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল আলাদা করে থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। ওই দিনই কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ব্রিজের কাছে একটি ঝোপ থেকে বস্তায় মোড়া দু’টুকরো করা দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে হাসপাতালে গিয়ে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম দেহটি তাঁর বোনের বলে শনাক্ত করেন।
শিমুর মৃত্যুর তদন্ত শুরু করে পুলিশ প্রথমে তাঁর পরিচিতজন এবং চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে। পুরনো একটি বিরোধের কারণে অভিনেতা জায়েদ খানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তবে সেই তদন্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপর তদন্তকারীদের নজর যায় শিমুর পরিবারের ব্যবহৃত গাড়িটির দিকে। গাড়ির ভেতর থেকে ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ পাওয়া যায়, যা দেখে পুলিশের সন্দেহ বাড়ে। গাড়িতে পাওয়া একটি নাইলনের দড়ির বান্ডিলও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ শিমুর দেহ যে বস্তায় রাখা হয়েছিল, সেটি সেলাই করতে যে দড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল, তার সঙ্গে গাড়িতে পাওয়া দড়ির মিল ছিল।
এরপর পুলিশ শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল এবং তাঁর বন্ধু এস এম ওয়াই আবদুল্লাহ ফারহাদসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে সাখাওয়াত পুরো ঘটনা স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারি সকালে শিমু শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হননি। বরং সকাল ৭টার দিকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। সেই সময় সাখাওয়াত শিমুকে মারধর করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর ফারহাদকে ডেকে এনে দুজনে মিলে দেহটি দু’টুকরো করেন। বস্তার মধ্যে দেহ ভরে নাইলনের দড়ি দিয়ে সেটি সেলাই করে গাড়ির ট্রাঙ্কে রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, ওই দিন দুপুরে দেহটি ফেলে আসার চেষ্টা করেও তাঁরা সফল হননি। পরে রাত ৯টার দিকে সাখাওয়াত ও ফারহাদ কেরানীগঞ্জের একটি নির্জন এলাকায় গিয়ে ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে আসেন। পরদিন সকালে স্ত্রী নিখোঁজ হয়েছেন জানিয়ে থানায় জিডি করেন সাখাওয়াত। তদন্তে আরও জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চলছিল। শিমুকে সন্দেহ করা, পারিবারিক সমস্যা এবং আর্থিক চাপ নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই ঝামেলা হত। করোনা পরিস্থিতির সময় আর্থিক সমস্যাও বেড়েছিল। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে শিমু স্বামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে।
আরও পড়ুনঃ মহেশতলার নামী স্কুলে শ্রাবন্তীর বোনপোর চোখে গুরুতর আ’ঘাত! দায় এড়িয়ে যাওয়া থেকে ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টায় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষো’ভ ফেটে পড়লেন অভিনেত্রী! নিলেন কোন পদক্ষেপ?
গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাখাওয়াত নিজের মেয়ে ওজিয়া আলিম রিদকে ফোন করে স্ত্রীকে হত্যার জন্য ক্ষমা চান বলেও জানা যায়। পুরো ঘটনার তদন্তে পরিবারের গাড়ি, গাড়ির চাকার দাগ, ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ এবং দড়ির সূত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এসব তথ্য মিলিয়ে পুলিশ শিমুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তাঁর স্বামীর যোগসূত্র খুঁজে পায়। শুরুতে নিখোঁজের ঘটনা মনে হলেও তদন্ত এগোতেই সামনে আসে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের তথ্য। শিমুর দেহ উদ্ধারের মাত্র একদিনের মধ্যেই তদন্তকারীরা এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো একত্র করতে সক্ষম হন।






