গ্ল্যামার দুনিয়ার ঝলমলে আলো, কোটি টাকার প্রলোভন আর মুম্বইয়ের বিলাসবহুল জীবনকেও অনায়াসে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন যে মানুষটি, তিনি হলেন অরিজিৎ সিং। গত জানুয়ারিতে প্লেব্যাক সিঙ্গিং থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে তিনি চমকে দিয়েছিলেন অনুরাগীদের। কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্তের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শিকড়ের টান। কেন বারবার তিনি ফিরে আসেন মুর্শিদাবাদের ছোট্ট শহর জিয়াগঞ্জে, সেটাই জানালেন তাঁর বাবা সুরিন্দর সিং। এক সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁদের পরিবারের দেশভাগের ইতিহাস, সংগ্রাম আর নতুন করে ঘর বাঁধার কাহিনি।
অরিজিতের পারিবারিক শিকড় জড়িয়ে আছে লাহোরের মাটিতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের উত্তাল সময়ে সব কিছু ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে এপার বাংলায় পাড়ি দিতে হয়েছিল তাঁদের পরিবারকে। সুরিন্দর সিং জানান, তাঁদের আদি বাড়ি ছিল লাহোরের কাছে, সেখান থেকে তাঁর বাবা ও তিন কাকা চলে আসেন লালগোলায়। পেশায় তাঁরা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। শূন্য থেকে নতুন জীবন শুরু করার জেদই তাঁদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে আসে জিয়াগঞ্জের গঙ্গার ধারে। নদীর পাড়ে একটি বাড়ি খুঁজে পাওয়া এবং সেখানেই বসতি গড়া ছিল তাঁদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

জিয়াগঞ্জের অলিগলিতে অরিজিৎ আজও পরিচিত শমু নামে। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে গুরুদ্বারে যাওয়া, বিশেষ অনুষ্ঠানে কীর্তন গাওয়া, সেখানেই সুরের প্রথম পাঠ নেওয়া— এইসব স্মৃতিই আজও তাঁর জীবনের ভিত। সুরিন্দর সিং বলেন, মুম্বইয়ে থেকে গেলেও তাঁর ছেলে কখনও সেই পরিবেশে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। জিয়াগঞ্জের শান্ত পরিবেশ আর মাটির টানই তাঁকে বারবার টেনে আনে। একজন মহাতারকার বাবা হিসেবে কেমন লাগে জানতে চাইলে তিনি হাসতে হাসতেই বলেন, মানুষ এখন তাঁর কাছে ছেলের পরের কাজের খবর জানতে চায়, আর সেটাই তাঁর কাছে মজার।
প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেও গান থেকে যে দূরে থাকা যায় না, তা প্রমাণ করেছে অরিজিতের সাম্প্রতিক কাজ। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তাঁর স্বাধীন একক গান রায়না, যার সুর করেছেন শেখর রাভজিয়ানি। গানটি ইতিমধ্যেই শ্রোতাদের মন জয় করে নিয়েছে এবং নেটমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে স্পষ্ট, মঞ্চ থেকে দূরে থাকলেও সুরের জগৎ থেকে তিনি সরে যাননি, বরং নিজের মতো করে নতুন পথ খুঁজে নিয়েছেন।
কাজের বাইরে এখন অরিজিৎ পুরোপুরি জিয়াগঞ্জবাসী। নিজের সন্তানদের স্থানীয় স্কুলে পড়ানো থেকে শুরু করে এলাকার স্কুল ও হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন তিনি। মুম্বইয়ের চাকচিক্যের বদলে নিজের শিকড়কে আগলে রাখতেই বেশি স্বচ্ছন্দ এই শিল্পী। তাঁর জীবনের গল্প যেন প্রমাণ করে, খ্যাতি আর সাফল্যের চেয়েও বড় হল নিজের মাটির টান। লাহোর থেকে জিয়াগঞ্জ পর্যন্ত সিং পরিবারের এই যাত্রা তাই শুধু ইতিহাস নয়, এক অনুপ্রেরণার গল্পও বটে।





