উত্তমকুমারের চোখের চাহনি এবং সেই মুগ্ধ করা হাসি একসময় বাঙালিকে রীতিমতো মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলা সিনেমায় তখন প্রচলিত থিয়েটারি অভিনয়ের ধারা বেশ জোরালো ছিল। সেই ধারার বাইরে গিয়ে উত্তমকুমার তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা অভিনয়ের ধরন। হলিউডের বাস্তবধর্মী অভিনয়শৈলী থেকেও তিনি অনেক কিছু গ্রহণ করেছিলেন। তার সঙ্গে মিশিয়েছিলেন বাংলা ভাষার স্বাভাবিক উচ্চারণ, সংলাপ বলার ধরন এবং সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি। ফলে শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক হিসেবেই নয়, বাংলা সিনেমার অভিনয়ের ভাষা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, সিনেমার ধরন বদলেছে, নায়কের সংজ্ঞাতেও এসেছে পরিবর্তন, কিন্তু এত বছর পরেও উত্তমকুমার এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
উত্তমকুমারের প্রয়াণের পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৮১ সালে টলিউডে পা রাখেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী। তখন অবশ্য তাঁর নাম ছিল দীপক চক্রবর্তী, পরবর্তীতে তিনি চিরঞ্জিৎ নামে পরিচিত হন। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে টলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এই অভিনেতা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, উত্তমকুমারের অভিনীত কোনও চরিত্রে সুযোগ পেলে তিনি কোন চরিত্রটি বেছে নিতেন। প্রশ্নটি শুনে চিরঞ্জিৎ প্রথমেই জানান, তাঁর কাছে উত্তমকুমারের কোনও চরিত্রে নিজেকে ভাবাটাই এক ধরনের স্পর্ধার বিষয়। এই বক্তব্যের মধ্যেই তিনি বুঝিয়ে দেন, অভিনেতা হিসেবে মহানায়ককে তিনি ঠিক কতটা উঁচু জায়গায় রাখেন। তবে কল্পনার খাতিরে যদি একটি চরিত্র বেছে নিতেই হয়, তাহলে নিজের পছন্দের কথাও জানিয়েছেন চিরঞ্জিৎ।
চিরঞ্জিতের পছন্দ উত্তমকুমারের ‘যদুবংশ’ ছবির গণাদা চরিত্র। এই চরিত্রটির প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণের কারণও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর মতে, গণাদার চরিত্রে উত্তমকুমারকে দেখে একেবারেই মনে হয়নি যে পর্দায় মহানায়ক অভিনয় করছেন। কারণ চরিত্রটির মধ্যে চেনা নায়কোচিত কোনও ছাপ ছিল না। চিরঞ্জিতের কথায়, ‘‘উত্তমবাবু ‘যদুবংশ’ ছবিতে যেমন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, সেই চরিত্রে অভিনয় করতে চাইতাম। চরিত্রের নাম ছিল গণাদা। ওটাই এমন একটা চরিত্র, যেটা দেখে আমার মনে হয়নি তিনি উত্তমকুমার। যেখানে নায়কোচিত কোনও ছাপই ছিল না।’’ এই কারণেই উত্তমকুমারের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে গণাদাকেই অভিনয়ের জন্য বেছে নিতেন তিনি।
শুধু পছন্দের চরিত্র নয়, উত্তমকুমারের এত বছর ধরে অটুট থাকা জনপ্রিয়তার কারণ নিয়েও কথা বলেছেন চিরঞ্জিৎ। তাঁর মতে, মহানায়কের অসময়ে চলে যাওয়া এবং তাঁর অভিনয় জীবনের নানা ধরনের চরিত্র এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। একজন অভিনেতার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত চরিত্রেও পরিবর্তন আসে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাবা, কাকা কিংবা দাদুর মতো চরিত্রে অভিনয় করার সময়ও আসে। কিন্তু উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে সেই দীর্ঘ যাত্রা সম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ হয়নি। চিরঞ্জিতের মতে, উত্তমকুমার যদি আরও অনেক বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো তাঁকেও বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন চরিত্রে দেখা যেত। আর সেক্ষেত্রে আজকের মতো তাঁর তারকা পরিচয় একই জায়গায় থাকত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও পড়ুনঃ হিন্দি সিরিয়ালের প্রস্তাব ফিরিয়েছেন! এবার কি তবে ‘গোয়েন্দা গিন্নি’র দ্বিতীয় সিজন নিয়ে ফিরছেন ইন্দ্রাণী হালদার?
উত্তমকুমারের দীর্ঘস্থায়ী স্টারডম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিডিওতে চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী বলেন, “স্টার উত্তম কুমারের মতো কেন হয় না? তার কারণ হচ্ছে একজন লোক সারা জীবন ধরে যতদিন ক্যারিয়ার উনি তৈরি করেছেন, উনি যদি আরও বেশি বছর বাঁচতেন আর বৃদ্ধের রোল করতে আরম্ভ করতেন বাবা, কাকা, দাদুর তাহলে উত্তম কুমার এইটা থাকতেন না। যেমন সৌমিত্রদা নিজেকে লুকিয়ে রেখে সেটা করেছিলেন, উনি কিন্তু শুরু থেকেই প্রফেশনাল। উনি যে হেতু ন্যাচারালি মহাপ্রস্থানের পথে চলে যান এবং সেটা মানুষের কাছে এমনই মনে হয় যে ওটাই রাইট টাইম টু গো, যার জন্য উত্তম কুমার উত্তম কুমারের অবস্থাতেই রয়ে গিয়েছিলেন।” অর্থাৎ চিরঞ্জিতের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজের বয়সের সঙ্গে চরিত্র বদলে অন্যভাবে নিজেকে ধরে রেখেছিলেন। অন্যদিকে উত্তমকুমার স্বাভাবিকভাবেই চলে যাওয়ায় তাঁর তারকা ইমেজটি মানুষের মনে সেই সময়ের জায়গাতেই স্থায়ী হয়ে যায়।






