নারীদের জীবনের প্রতিটি ধাপে নানা বাধা। ছোট থেকে শেখানো হয়, “সব মানিয়ে নিতে হয়।” কিন্তু সব কি সত্যিই মানিয়ে নেওয়া যায়? শরীরের স্বাভাবিক চক্র, যা একজন নারীকে মা হওয়ার ক্ষমতা দেয়, সেটাই যখন সামাজিক ট্যাবু হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে— এই মানসিকতার পরিবর্তন কবে হবে? ঋতুস্রাব নিয়ে আলোচনা করা আজও অনেকের কাছে নিষিদ্ধ, অথচ এই কয়েকটা দিন অনেক মহিলার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। কাজের জায়গায় ছুটি চাইলেও শুনতে হয়, “এটা তো প্রতি মাসেই হয়, এতে এত বাড়াবাড়ি কী!” বছরের পর বছর ধরে নারীদের এই সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সমাজেরই একাংশ মনে করে, “ব্যথা তো সবাই সয়ে নেয়, তুমিও নাও।” অথচ একজন পুরুষের মাথা ধরলেই তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলা হয়। ঋতুস্রাবের কষ্টকে ‘ন্যাকামি’ বলে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা আজও রয়েছে, আর সেটাই এবার প্রশ্নের মুখে তুললেন জনপ্রিয় গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী।
লগ্নজিতা বলেন, সব নারীর শরীরে ঋতুস্রাবের প্রভাব একরকম হয় না। তিনি নিজে আগে ব্যথা অনুভব করতেন না, কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পেটে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। তখনই তিনি বুঝেছেন, এতদিন যাঁরা ব্যথার কথা বলতেন, তাঁরা আদৌ ‘ন্যাকামো’ করতেন না। বরং সমাজ তাঁদের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়নি। তিনি স্পষ্ট বলেন, “একজন পুরুষকে কি তিনদিন টানা তীব্র পেটব্যথা নিয়ে অফিস যেতে হয়?” নারী-পুরুষের শারীরিক গঠন আলাদা, কিন্তু এই পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে সমাজ এখনও পিছিয়ে আছে। তাই ঋতুস্রাবের সময় ছুটির প্রসঙ্গ উঠলেই বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবটা হল, কষ্ট সহ্য করলেও তা লঘু হয়ে যায় না।
শুধু ঋতুস্রাবের কষ্ট নয়, নারীদের সামাজিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেছেন লগ্নজিতা। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একসময় স্যানিটারি ন্যাপকিনের অস্তিত্বই ছিল না। মেয়েরা কাপড় কেটে ব্যবহারের জন্য বাধ্য হতেন। কিন্তু কেউ একজন ভেবেছিল বলেই আজ সুবিধা বেড়েছে। তাহলে এই চিন্তাভাবনার জায়গাটা কেন রোধ করা হবে? একটি আলোচনায় তাঁর এক পরিচিতা বলেছিলেন, “অত ভাবিস না।” কিন্তু লগ্নজিতার মতে, অতীতের কেউ ভেবেছিলেন বলেই আজ নারীরা এগোতে পেরেছেন। তাই নতুন করে ভাবনার দরকার আছে, যাতে নারীরা আরও স্বাধীনভাবে নিজেদের শারীরিক চাহিদার কথা বলতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ রঙের উৎসবে ঝড়-বৃষ্টি! হোলির দিন কোথায় বৃষ্টি, কোথায় চরম গরম? জানুন আবহাওয়ার পূর্বাভাস
নারীদের সবসময় বলা হয় মানিয়ে নিতে, কিন্তু বাড়ির পুরুষদের কি মানিয়ে নেওয়া উচিত নয়? লগ্নজিতা মনে করেন, নারীদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তবেই সমাজ বদলাবে। তিনি বলেন, “একসময় মহিলাদের ‘স্তন কর’ দিতে হত। কেউ প্রতিবাদ করেছিল বলেই সেটা বন্ধ হয়েছে।” কিন্তু সেই পরিবর্তন সহজ ছিল না, রক্ত ঝরেছে, লড়াই করতে হয়েছে। তাই আজকের সমাজেও শুধু মানিয়ে নিলে চলবে না, পরিবর্তনের জন্য সরব হতে হবে। যারা সমস্যা অনুভব করেন না, তাঁরা এটাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু সত্যিটা হল, কেউ একজন না ভাবলে, কোনও সমস্যার সমাধান হয় না।
লগ্নজিতার বক্তব্য নারীদের বাস্তব সমস্যার প্রতিচ্ছবি। নারী-পুরুষ সমান হলেও শারীরিক গঠনে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু সেটার কারণে নারীদের দুর্বল ভাবার কোনও যুক্তি নেই। আজকের সমাজে নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া জরুরি, বিশেষ করে তাঁদের স্বাস্থ্যের প্রতি। নারীরা সন্তান জন্ম দিতে পারেন বলে তাঁদের সব ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা আছে— এই ধারণা বদলানো দরকার। একজন পুরুষ সহজে ভারী ওজন তুলতে পারেন, কিন্তু তাঁর শরীরেও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই নারী-পুরুষের সমান অধিকারের লড়াই তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করব। এবং সেটার জন্য ভাবতে হবে, প্রশ্ন তুলতে হবে, আওয়াজ তুলতে হবে— যেমনটা করেছেন লগ্নজিতা চক্রবর্তী।






