“উত্তম কুমার দেখতে ভালো ছিলেন না, সৌন্দর্যের সংজ্ঞাতেও নয়…মহানায়ক হলেও তিনি দেবতাও নন” বিতর্কিত মন্তব্য সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের! আরও বলেন ‘আনস্মার্ট’ ছিলেন উত্তম, ‘গৌরাঙ্গের প্রতিচ্ছবি’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! মন্তব্যের জেরে চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপকের সমালোচনায় মুখর সামাজিক মাধ্যম!

বাংলার চলচ্চিত্রচর্চা ও সমালোচনার জগতে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। তিনি প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক, সমালোচক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক। সাহিত্য, সিনেমা এবং বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর লেখালেখি ও গবেষণা। ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিভিন্ন পরিচালক ও তাঁদের কাজ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিশেষভাবে পরিচিত। ‘ঋত্বিকতন্ত্র’, ‘অনভিজাতের অপেরা’, ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’ এবং ‘পাতালের চিরকুট’ তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে। চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর লেখায় বরাবরই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা দেখা যায়। উত্তম কুমার নিয়েও অতীতে তাঁর লেখায় এমনই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, আর এবার মহানায়কের জন্মশতবর্ষের সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্যই এখন সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, উত্তম কুমার মোটেই সুন্দর ছিলেন না এবং তাঁকে দেবতা বলেও মনে করার কারণ নেই। তাঁর এই বক্তব্যের একটি অংশ শুনেই নেটমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা ও নানা প্রশ্ন। তবে সম্পূর্ণ বক্তব্য শুনলে তাঁর কথার অন্য একটি দিকও স্পষ্ট হয়। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতে, উত্তম কুমারের আসল আকর্ষণ তথাকথিত নায়কোচিত সৌন্দর্যে ছিল না। বরং তাঁর সামান্য আনস্মার্টনেস, কথা বলার মাঝখানে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যাওয়া এবং উত্তর কলকাতার টান মেশানো কথা তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছের করে তুলেছিল। অর্থাৎ তাঁর জনপ্রিয়তার মূল জায়গাটি ছিল, পর্দার তারকা হয়েও তাঁকে যেন পাশের বাড়ির একজন মানুষ বলে মনে হত।

এই জায়গাটিকেই উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেছেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন অশান্ত বাংলার সেই সময়কে, যখন হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এদিকে চলে এসেছিলেন। অনেকের মাথার উপর ছাদ ছিল না, পেটে খাবার ছিল না, জীবন ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। সেই পরিস্থিতিতে উত্তম কুমার তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হয়ে কথা বলেছিলেন বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই কীভাবে অসাধারণ হয়ে থেকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া যায়, সেই বিষয়টি ফুটে উঠেছিল। কখনও বড়লোক পরিবারের ছেলে হয়ে গরিব বা প্রান্তিক মেয়েকে বিয়ে করেছেন, আবার কখনও গল্পে তার ঠিক উল্টো সামাজিক অবস্থানের চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এই কারণেই তাঁর নায়ক হয়ে ওঠা শুধু চেহারা বা তথাকথিত সৌন্দর্যের উপর নির্ভর করেনি, বরং মানুষের জীবনের সঙ্গে তাঁর চরিত্রগুলির যোগই তাঁকে এত আপন করে তুলেছিল।

তবে উত্তম কুমারের সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় আরও একটি তুলনা টেনেছেন। তাঁর মতে, উত্তম কুমার কখনওই প্রচলিত অর্থে যাঁকে সুন্দর পুরুষ বলা হয়, সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়েন না। তিনি বরং মনে করেন, দেবতার বা গৌরাঙ্গের রূপের কথা যদি বলা হয়, সেই তুলনায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনেক বেশি মানানসই। অর্থাৎ তাঁর চোখে সৌমিত্রের চেহারায় যে গৌরাঙ্গের মতো প্রতিচ্ছবি রয়েছে, উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে সেই মাপকাঠি প্রযোজ্য নয়। এই মন্তব্যই এখন উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের আবহে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল উত্তম কুমারকে ছোট করা নয়, বরং কেন একজন তথাকথিত ‘সাধারণ’ চেহারার মানুষ এত বড় তারকা হয়ে উঠলেন, তা ব্যাখ্যা করা। আর সেই ব্যাখ্যাতেই উঠে এসেছে মহানায়কের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি তারকা হয়েও সাধারণ মানুষের একজন হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ এবার বাংলার সংস্কৃতি রক্ষায় বড় দায়িত্বে ‘মহাগুরু’ মিঠুন চক্রবর্তী! বিরাট ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী! কী জানেন?

উত্তম কুমারকে নিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য তাই একদিকে যেমন বিতর্ক তৈরি করেছে, অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘদিনের চলচ্চিত্র ভাবনার সঙ্গেও মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। আগেও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে, উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার পিছনে শুধু অভিনয় প্রতিভা নয়, তাঁর সময়কে ধরতে পারার ক্ষমতাও বড় কারণ। সাংস্কৃতিক কৌলীন্যের বাইরে থেকেও কীভাবে তিনি জনসাধারণের একজন হয়ে কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন, সেই ব্যাখ্যাও তাঁর লেখায় পাওয়া যায়। তাই ‘সুন্দর ছিলেন না’ বা ‘দেবতা ছিলেন না’ কথাগুলিকে আলাদা করে দেখলে বক্তব্যটি যতটা কঠিন শোনায়, সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ শুনলে তাঁর যুক্তির জায়গাটি কিছুটা অন্যরকম। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন, উত্তম কুমারের মহানায়ক হয়ে ওঠার জন্য নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রয়োজন হয়নি। সাধারণ মানুষের মতো দেখতে, কথা বলতে এবং তাঁদের জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পারাটাই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছিল। আর সেই কারণেই সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য বিতর্কের পাশাপাশি উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার আসল রহস্য নিয়েও নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর