বাংলাদেশের (Bangladesh) ইতিহাস যেমন সংগ্রামের, তেমনই সহিষ্ণুতারও। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি উদার, অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল সে সময়ের বাঙালিরা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে যে দেশ হিসেবে চেনা হয়, তা শুধুই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নয়, বরং তার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও। এক সময় যে দেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন ও ধর্মীয় সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, আজ সেই দেশেই সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। মন্দির ভাঙচুর, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে এই হিংসার ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চিন্তায় ফেলেছে দেশটির শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের।
এই পরিস্থিতি নিয়ে এবার মুখ খুললেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি গভীর। কারণ তাঁর শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে ঢাকায়, যেখানে তিনি স্কুলজীবন শুরু করেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমাকে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। আমার মায়ের দিক থেকেও আমি বিক্রমপুরের সঙ্গে যুক্ত। তাই এই দেশ আমার কাছে একান্তই ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।” বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজকের পরিস্থিতি খুবই দুঃখজনক। ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতন্ত্রের যে ভিত্তির ওপর দেশটি দাঁড়িয়ে ছিল, তা আজ সংকটে।”
আরও পড়ুনঃ ভাইরাসের অশনিসংকেত! ক্রমশ বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, ভারতে ফের মহামারির ছায়া?
বিশেষ করে হিন্দুদের উপর অত্যাচার নিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাস সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার পক্ষে ছিল। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে মন্দির ধ্বংস করা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের হত্যা ও নির্যাতন করা হচ্ছে, তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই হিংসা বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব।” তাঁর এই বক্তব্য মৌলবাদীদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামাত-ই-ইসলামি তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে। সংগঠনের প্রধান শফিকুর রহমান দাবি করেছেন, “অমর্ত্য সেন আওয়ামি লিগের পক্ষ নিচ্ছেন এবং একপেশে মন্তব্য করছেন।”
তবে জামাতের এই প্রতিক্রিয়া দিয়েই পরিস্থিতির গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। অমর্ত্য সেনের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন দেখার। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন ও বিশ্লেষকরা নজর রাখছেন এই পরিস্থিতির উপর। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরাও এখন অপেক্ষায়, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও হিংসার এই পর্ব থেকে আদৌ মুক্তি মিলবে কি না।





