কলকাতার রাস্তায় হাঁটলেই ইতিহাস যেন নিজেই সামনে এসে দাঁড়ায়। শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের সামনেই এমনই এক আশ্চর্য দৃশ্য— চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লালচে রঙের এক কালীমন্দির। সকলে যাকে ভালোবেসে ডাকেন ‘লাল মন্দির’। প্রতিদিন হাজারো গাড়ি, বাস, ট্রাম পেরিয়ে যায় তার পাশ দিয়ে, অথচ মন্দিরটি আজও অক্ষত।
এই মন্দিরের বয়স অন্তত ২৫০ বছরেরও বেশি বলে জানান মন্দিরের কর্মকর্তা বিপ্রদাস ভট্টাচার্য। পুরোহিত নীলাম্বর ভট্টাচার্য, তাঁর পূর্বপুরুষ অমরকৃষ্ণ চক্রবর্তী ছিলেন এক তন্ত্রসাধক। তখন এখানে ছিল মাত্র একটি মাটির ঘর, যেখানে তিনি তন্ত্রসাধনা করতেন। সেই সাধনালয়ের থেকেই নাকি জন্ম নেয় এই মন্দিরের ইতিহাস। অনেকের মতে, শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের রাজবাড়ির মেয়েরাই শক্তিপূজার জন্য এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কারণ রাজবাড়ির আরাধ্য ছিলেন কৃষ্ণ।
জনশ্রুতি আছে, এক সময় দুর্ধর্ষ ডাকাত রঘু রাজবাড়ির ধনসম্পদের সঙ্গে মা যোগমায়ার মূর্তিটিও লুঠ করে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ফেলে দেয়। সেই সময় অমরকৃষ্ণ চক্রবর্তী স্বপ্নে দেখেন দেবী তাঁকে সেই মূর্তি উদ্ধারের নির্দেশ দিচ্ছেন। ভোরে তিন বার ডুব দিয়ে তিনি পুকুর থেকে মায়ের মূর্তি উদ্ধার করেন। সেই মূর্তিই পরে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ছিল কাঁচা ঘর, পরে ব্রিটিশ আমলে সেটি পাকা করে লাল রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়— আর সেখান থেকেই নাম ‘লাল মন্দির’।
এমন ব্যস্ত রাস্তায় মন্দিরের অবস্থান দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— কেন সরানো হয়নি? ব্রিটিশ প্রশাসকরা রাস্তা সম্প্রসারণের সময় মন্দির ভাঙার পরিকল্পনা করলেও একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। কথিত আছে, যারা মন্দির ভাঙতে গিয়েছিল, তাদের মুখে রক্ত উঠে মৃত্যু হয়। এরপর থেকে কেউ আর স্থান পরিবর্তনের সাহস দেখায়নি। এমনকি মেট্রো নির্মাণের সময়ও মন্দিরের একটিও ইট নড়ে না— তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাকি মন্দির অক্ষত রাখতে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ Astrology: ২০২৬ সালে ভাগ্যের জোয়ার! সুখ, সমৃদ্ধি আর সাফল্যে ভরবে এই ৫ রাশি
আজও ২৩/২ রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের এই লাল মন্দিরে নিয়মিত পূজা হয়। প্রতি বৃহস্পতি ও শনিবার বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। দেবী যোগমায়ার পাশাপাশি এখানে পূজিত হন গোপাল, শিব, অন্নপূর্ণা সহ আরও বহু দেবতা। নিত্য পথচলতি মানুষ প্রণামী রেখে যান, কেউ থেমে প্রণাম করেন— কিন্তু খুব কম জনই জানেন এই মন্দিরের গোপন ইতিহাস। ব্যস্ত শহরের বুকেও যেন এখানেই সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে— ‘লাল মন্দির’-এর অলৌকিক কাহিনিতে।





