সুরেন্দ্রনাথ কলেজে উইপোকায় খাওয়া লক্ষ লক্ষ টাকার হদিশ, মিলল ক*ন্ডোম ও মদের বোতল, তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক অভি*যোগ, এবার কি ফাঁস হবে কি দীর্ঘদিনের অন্দরমহলের রহস্য?

কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুরেন্দ্রনাথ কলেজকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসায় তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজ্যের শিক্ষা ও রাজনৈতিক মহলে। প্রথমে কলেজের একটি বন্ধ ইউনিয়ন রুম থেকে উদ্ধার হয় উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। এরপর তল্লাশি চালিয়ে কলেজ চত্বরে বিলাসবহুল বেডরুম, আগ্নেয়াস্ত্র, কন্ডোমের প্যাকেট এবং মদের বোতল উদ্ধারের ঘটনাও সামনে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে এমন সব সামগ্রী এবং পরিকাঠামোর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অভিযোগগুলিকে ঘিরে। একইসঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা।

ঘটনার সূত্রপাত কলেজের একটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ইউনিয়ন রুমকে ঘিরে। অভিযোগ, গত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই ওই ঘরে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে ঘর পরিষ্কারের জন্য পুরসভার সাফাই কর্মীরা এলে দেখা যায় চাবির কোনও হদিশ নেই। পরিস্থিতির জেরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীরা তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। ঘর খুলতেই আবর্জনার স্তূপের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায় দুটি ট্রলি স্যুটকেস। সেগুলি খুলতেই বেরিয়ে আসে বান্ডিল বান্ডিল নগদ টাকা। দীর্ঘদিন বন্ধ ঘরে পড়ে থাকায় নোটের বড় অংশই উইপোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শুধু টাকা নয়, ঘর থেকে বেশ কিছু আর্থিক নথি ও ভাউচারও উদ্ধার হয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে এই নথিগুলি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। চাবি রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের উপস্থিতি ঘিরে তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

টাকা উদ্ধারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলেজের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ, কলেজ ভবনের উপরের তলায় ‘টেরেস ফেসিলিটি’-র নামে তৈরি দুটি ঘর কার্যত বিলাসবহুল ব্যক্তিগত স্যুইট হিসেবে ব্যবহার করা হত। সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, খাট, দামি গদি, আলমারি, অ্যাটাচড বাথরুম, শাওয়ার এবং অন্যান্য আরামদায়ক সরঞ্জাম পাওয়া যায়। কলেজের একাংশের দাবি, এই ঘরগুলিতে নিয়মিত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির যাতায়াত ছিল। শুধু তাই নয়, ছাদে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক মদের বোতলও উদ্ধার হয়েছে বলে অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরেই কলেজের কিছু কর্মী ও স্থানীয়দের তরফে অভিযোগ উঠছিল যে ছাদ এবং নির্দিষ্ট কিছু কক্ষে শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে অসঙ্গত নানা কার্যকলাপ চলত। যদিও অভিযোগ করা সত্ত্বেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই দাবি তাঁদের। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে এই ধরনের পরিকাঠামো কীভাবে গড়ে উঠল এবং কার অনুমতিতে ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এদিকে কলেজের কমনরুম থেকে কন্ডোমের প্যাকেট এবং ইউনিয়ন রুম থেকে কালো প্যাকেটে মোড়া একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অস্ত্রটি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে এবং তার উৎস ও ব্যবহার সংক্রান্ত তদন্ত শুরু করেছে। একই দিনে নগদ অর্থ, আগ্নেয়াস্ত্র, কন্ডোমের প্যাকেট এবং বিলাসবহুল বিশ্রামকক্ষের সন্ধান মেলার ফলে গোটা ঘটনাই নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের এই বিশেষ ঘরগুলি তৃণমূল ঘনিষ্ঠ নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে কানকাটা দেবু এবং তাঁর ছেলে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যবহার করতেন। আরও অভিযোগ, ওই কক্ষগুলিতে নানা ধরনের ব্যক্তিগত পরিষেবার ব্যবস্থাও ছিল। যদিও দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট বেডরুম বা ওই ধরনের কোনও ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে অভিযোগ ও পাল্টা দাবির মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে কৌতূহল এবং বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে।

আরও পড়ুনঃ টলিউডের ছায়া এবার বলিউডেও! রবিনা ট্যান্ডনের বাড়িতে সিন্দুক ভেঙে ২৫ লক্ষ টাকা ও সোনার গয়না চুরি, পরিচারিকার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের! পাল্টা অভিনেত্রীকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি অভিযুক্তের!

ঘটনার জেরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ কলেজে পৌঁছে পুরো বিষয়টিকে দুর্নীতি ও প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ভর্তি প্রক্রিয়া, নির্মাণকাজ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিভিন্ন কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক অর্থ আদায়ের একটি বড় নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে। উদ্ধার হওয়া বিপুল নগদ অর্থ সেই ব্যবস্থারই অংশ হতে পারে বলে দাবি তাঁর। একইসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয় এবং তদন্ত চলমান। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে বিপুল নগদ অর্থ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিলাসবহুল কক্ষ, মদের বোতল ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে। এখন নজর তদন্তের দিকে উদ্ধার হওয়া টাকার প্রকৃত উৎস কী, কারা এই ঘরগুলি ব্যবহার করত, অস্ত্রটি কোথা থেকে এল এবং অভিযোগের পেছনে কতটা সত্যতা রয়েছে, সেই উত্তর খুঁজতেই তৎপর পুলিশ ও প্রশাসন।

Jui Nag

আমি জুই নাগ, পেশায় নিউজ কপি রাইটার, লেখালেখিই আমার প্যাশন। বিনোদন, পলিটিক্স ও সাম্প্রতিক খবর পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য। তথ্যভিত্তিক ও আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে সঠিক সংবাদ পৌঁছে দিই।

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর