রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন একের পর এক নাটকীয় মোড় নিচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতি সংক্রান্ত তদন্ত ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে দলীয় অন্দরে ভাঙনের জল্পনাও তুঙ্গে। এমন এক রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যেই সিআইডি-র জারি করা নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন অভিষেক। শুধু নোটিস বাতিলের আবেদনই নয়, তদন্তের প্রেক্ষিতে যাতে তাঁকে গ্রেফতার না করা হয়, সেই বিষয়েও আদালতের কাছে সুরক্ষার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। ফলে রাজনৈতিক ও আইনি দুই মহলেই এই পদক্ষেপ ঘিরে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা।
সূত্রের খবর, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, ওই নথিতে থাকা কিছু স্বাক্ষর আসল নয় এবং সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের স্বাক্ষরের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নামে সিআইডি। তদন্তকারীরা বিষয়টির নেপথ্যে কারা রয়েছেন এবং কীভাবে ওই নথি তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজিরার নোটিস পাঠানো হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মামলার বিভিন্ন দিক স্পষ্ট করার জন্য তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্তের অংশ হিসেবে গত ১ জুন ভবানীভবনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল অভিষেককে। তবে নির্ধারিত দিনে তিনি হাজির হননি। পরিবর্তে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তদন্তকারী সংস্থার কাছে লিখিতভাবে নিজের অবস্থান জানান। এরপর সিআইডি আধিকারিকরা তাঁর কালীঘাটের বাসভবনে গিয়ে নতুন করে নোটিস পৌঁছে দেন। সেই নোটিসে আগামী ৮ জুন হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু তার আগেই আদালতের দ্বারস্থ হয়ে গোটা প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল নেতা। তাঁর বক্তব্য, নোটিস জারির ক্ষেত্রে আইনি কিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যা বিচারিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেই কারণেই তিনি আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের ভিত্তিতে বিচারপতি অপূর্ব সিনহা রায় মামলাটি গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। জানা গিয়েছে, আগামী শুক্রবার মামলার শুনানি হতে পারে। আদালতে তাঁর পক্ষ থেকে শুধু নোটিস বাতিলের আবেদনই নয়, তদন্ত চলাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই মামলায় একাধিক তৃণমূল বিধায়কের বয়ান রেকর্ড করেছে সিআইডি। তদন্তকারীরা বিভিন্ন নথি ও স্বাক্ষরের নমুনা খতিয়ে দেখছেন। ফলে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী নির্দেশ এখন এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক মহলেরও নজর এখন হাইকোর্টের আসন্ন শুনানির দিকে।
আরও পড়ুনঃ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে উইপোকায় খাওয়া লক্ষ লক্ষ টাকার হদিশ, মিলল ক*ন্ডোম ও মদের বোতল, তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক অভি*যোগ, এবার কি ফাঁস হবে কি দীর্ঘদিনের অন্দরমহলের রহস্য?
অন্যদিকে এই আইনি লড়াই এমন এক সময় শুরু হল, যখন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে তৃণমূলকে ঘিরে একাধিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল এবং দলীয় সংগঠন নিয়ে নানা প্রশ্ন ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। বিশেষ করে ফলতা কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে দলের অন্দরে এবং বাইরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের পাশাপাশি তৃণমূলের একাংশ থেকেও অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে রাজনৈতিক মহলে চর্চা চলছে। সেই আবহে আবার বিধানসভায় দলীয় সমীকরণ বদলের সম্ভাবনা নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। ফলে একদিকে স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলার তদন্ত, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ ও দলীয় অস্থিরতা সব মিলিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। এখন আদালতের শুনানি এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ কোন দিকে পরিস্থিতিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল।






