বাংলা অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ কৃষ্ণকিশোর মুখার্জী। টেলিভিশন, সিনেমা, সিরিয়াল থেকে মঞ্চ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। একসময় টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদ সঞ্চালক হিসেবেও পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তাঁর। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল শিক্ষকতা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা জানিয়েছেন, কলকাতার নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুল লা মার্টিনিয়ারে বাংলা পড়ানোর সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আর সেই সময় ছাত্রদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা শুধু তাঁকে অবাক করেনি, সমাজ ও মূল্যবোধ নিয়েও ভাবিয়েছিল।
কৃষ্ণকিশোরের কথায়, বাঙালি পরিবারে ছোটবেলা থেকেই অনেক ধরনের সামাজিক রীতি মেনে চলতে শেখানো হয়। তার মধ্যে একটি হল কাউকে কিছু দেওয়া বা নেওয়ার সময় ডান হাত ব্যবহার করা। বাঁ হাতে কোনও জিনিস এগিয়ে দেওয়াকে অনেক পরিবারেই শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে মনে করা হয়। কিন্তু লা মার্টিনিয়ারে পড়ানোর সময় তিনি দেখেন, ছাত্রদের কাছে বিষয়টি একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ বাঁ হাতে জিনিস দিচ্ছে, আর সেটিকে সে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবেই দেখছে। এখানেই অভিনেতার কাছে সাংস্কৃতিক পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর উপলব্ধি হয়, বাড়ির পরিবেশ, পারিবারিক শিক্ষা এবং সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করেই শিশুর আচরণের অনেকটা তৈরি হয়।
অভিনেতা একদিন ছাত্রদের ‘শিক্ষা ও মূল্যবোধ’ নিয়ে রচনা লিখতে দিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, শিশুরা সততা, ভালো-মন্দের পার্থক্য, নীতি-নৈতিকতা কিংবা বড়দের সম্মান করার মতো বিষয় নিয়ে লিখবে। কিন্তু এক ছাত্রের লেখা তাঁকে অবাক করে দেয়। সেই ছাত্র প্রশ্ন তোলে, বড়রা যদি শিশুদের মিথ্যা বলা বা চুরি করা খারাপ বলে শেখান, তাহলে বাস্তব জীবনে বড়রাই যদি সবসময় সেই নিয়ম মেনে না চলেন, শিশুরা কাদের দেখে মূল্যবোধ শিখবে? অর্থাৎ, বইয়ের পাতায় যা শেখানো হচ্ছে আর বাস্তব জীবনে যা দেখা যাচ্ছে দুটির মধ্যে ফারাকটাই শিশুটির চোখে ধরা পড়েছিল।
এই ঘটনাই কৃষ্ণকিশোরকে আরও একটি বিষয় বুঝিয়েছিল। তাঁর মতে, শিশুদের মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে শুধু স্কুলের পড়াশোনা যথেষ্ট নয়। বাড়িতে বাবা-মায়ের আচরণ, সমাজের পরিবেশ এবং বড়দের কাজকর্মও শিশুদের শিক্ষার অংশ হয়ে যায়। শিক্ষক ক্লাসে যতই বলুন ‘মিথ্যা বলা উচিত নয়’, যদি কোনও শিশু নিজের চারপাশে তার বিপরীত উদাহরণ দেখে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন তৈরি হবে। তাই ওই ছাত্রের উত্তরকে তিনি শুধু বয়সের তুলনায় ‘অদ্ভুত’ যুক্তি হিসেবে দেখেননি, বরং বাস্তব সমাজকে দেখার এক ধরনের শিশুসুলভ উপলব্ধি হিসেবেই দেখেছেন।
আরও পড়ুনঃ “আড্ডার ছলে অনেক কথা হয় তখনই…” মহুয়া রায়চৌধুরীর ছেলে গোলাকে ছোটবেলায় ম’দ খাওয়ানো নিয়ে এবার মুখ খুললেন রত্না ঘোষাল! সত্যিই বাচ্চা ছেলেটিকে মদ খাওয়ানো হতো? কী বললেন রত্না ঘোষাল?
লা মার্টিনিয়ারে পড়ানোর সেই অভিজ্ঞতা তাই আজও কৃষ্ণকিশোরের কাছে বিশেষ। বাঁ হাতে জিনিস দেওয়ার মতো ছোট একটি সাংস্কৃতিক পার্থক্য থেকে শুরু করে ‘মূল্যবোধ’ নিয়ে ছাত্রের কঠিন প্রশ্ন সব মিলিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা যেন একটি বড় প্রশ্নই সামনে আনে। সত্যিই কি আজকের প্রজন্মের মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে, নাকি তারা বড়দের আচরণকে আরও তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করছে? কারণ শেষ পর্যন্ত শিশুদের শুধু মুখে কী শেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে তারা বাস্তবে কী দেখছে সেটাই হয়তো তাদের মূল্যবোধ তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।






