একশো বছরেরও বেশি সময় বিদেশে থাকার পর অবশেষে ভারতের ঘরে চোল যুগের ঐতিহাসিক তাম্রলিপি, মোদীর নেদারল্যান্ডস সফরকে কেন ‘ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
নেদারল্যান্ডস সফরে গিয়ে বড় কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সাফল্য পেল ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-র হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হল প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো চোল যুগের ঐতিহাসিক তাম্রলিপি। বহু বছর ধরে নেদারল্যান্ডসে সংরক্ষিত থাকা এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদ অবশেষে ফিরছে ভারতের ঘরে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত সরকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরেই সেই দাবি পূরণ হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে একে বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই নয়, ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসে পৌঁছনোর পর থেকেই একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের মধ্যেই ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয় চোল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক তাম্রলিপিগুলি। এই তাম্রলিপিগুলো ইউরোপে ‘লাইডেন প্লেটস’ নামেও পরিচিত। বহু বছর ধরে এগুলো লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এগুলো চোল সাম্রাজ্যের ইতিহাস ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত পুরনো এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নথি খুব কমই এখনও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তাম্রলিপিগুলো হাতে পেয়েই এক্স হ্যান্ডেলে আবেগঘন পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি লেখেন, “সকল ভারতীয়ের জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত। একাদশ শতকের চোল যুগের তাম্রলিপি নেদারল্যান্ডস থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।” তিনি অনুষ্ঠানের ছবিও শেয়ার করেন। মোদী আরও জানান, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন। তাঁর উপস্থিতিতেই ঐতিহাসিক নিদর্শন ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই তাম্রলিপিগুলিতে ২১টি বড় এবং ৩টি ছোট ফলক রয়েছে। বেশিরভাগ লেখাই তামিল ভাষায় খোদাই করা। মোদীর কথায়, “এই লিপিগুলো শুধু ইতিহাস নয়, চোলদের গৌরব ও ভারতীয় সংস্কৃতির উজ্জ্বল পরিচয় বহন করে।”
ভারত সরকার ২০১২ সাল থেকেই এই ঐতিহাসিক তাম্রলিপি ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। দীর্ঘ আলোচনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর অবশেষে সেই প্রচেষ্টা সফল হল। প্রধানমন্ত্রী মোদী নেদারল্যান্ডস সরকার এবং লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ ধন্যবাদও জানান। তিনি বলেন, ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে তারা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, চোল সাম্রাজ্য দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য ছিল। তাদের শাসনকালে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সমুদ্রবাণিজ্যে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এই তাম্রলিপিগুলো। ফলে এগুলোর ভারতে ফেরা শুধু প্রত্নসম্পদ পুনরুদ্ধার নয়, দেশের সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধারেরও প্রতীক।
আরও পড়ুন: রাতারাতি বদলে গেল হাওড়া স্টেশন চত্বর! বুলডোজার, আরপিএফ আর পুলিশের ঘেরাটোপে উ’চ্ছেদ শতাধিক অবৈধ দোকান!
উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডস সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদী বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বিশের দশক গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময় হয়ে উঠেছে। একের পর এক সংকট আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার দিকেই জোর দিচ্ছে বলে জানান তিনি। সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও সই হয়েছে। তবে সবকিছুর মধ্যেও চোল যুগের তাম্রলিপি ভারতের হাতে ফিরে আসাই এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ এই ঘটনা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ককেই আরও মজবুত করেনি, একই সঙ্গে ভারতের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।






