সমাজের মূল ভিত্তি হল পরিবার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান সহায়ক তাঁর পরিবার। বিশেষ করে বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের বড় করে তুলতে সমস্ত কিছু উৎসর্গ করেন, নিজের স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ত্যাগ করেন। অথচ সময়ের সাথে সাথে সমাজের কিছু চিত্র বদলে যাচ্ছে। বৃদ্ধ বয়সে অনেক বাবা-মাকেই সন্তানদের অবহেলা, নির্যাতন, এমনকি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। কিছু সন্তান দায়িত্ব এড়ানোর জন্য নানা অজুহাত খোঁজেন, কেউ আবার নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়ে গিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যান। একসময়ে যাঁরা সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের আশ্রয়টুকুও জোটে না!
সমাজের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা মাঝে মাঝে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব সম্পর্কে যে মূল্যবোধ থাকা উচিত, তা যেন আজকের অনেকের মন থেকে মুছে যাচ্ছে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা যখন সবচেয়ে বেশি যত্ন ও ভালোবাসার প্রয়োজন অনুভব করেন, তখন অনেক সন্তান তাঁদের বোঝা মনে করে ফেলে রেখে আসে একা-একা বাঁচার জন্য। শুধু অর্থ, শিক্ষা, এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়াই সব নয়, যদি মূল্যবোধ আর দায়িত্ববোধ না থাকে, তাহলে সেই সাফল্যের মূল্য কতটুকু? সম্প্রতি এমনই এক ঘটনা সামনে এসেছে, যা মানবিকতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভ মেলায় এক ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধাকে একা ঘুরতে দেখা যায়। তিনদিন ধরে তিনি মেলায় অপেক্ষা করছিলেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, যাঁরা তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছেন, তাঁরা ফিরে আসবেন। কিন্তু কেউই এল না। পরে জানা যায়, বৃদ্ধার নাম রেখা দ্বিবেদী। তাঁর চার ছেলেই শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত—একজন হাইকোর্টের আইনজীবী, একজন কলেজের লেকচারার। কিন্তু মাকে নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই! মহাকুম্ভের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার’-এর মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ছেলেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁরা মাকে ফিরিয়ে নিতে চান না। এক ছেলে তো স্পষ্টই বলে দেন, ‘‘মায়ের সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই, গুডবাই।’’
এরপরও রেখা দেবী ছেলেদের দোষ দিতে রাজি নন। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হয়েও তিনি বলেন, ‘‘ওরা অযোগ্য সন্তান নয়, ওরা খুব অসহায়। তাই এমন করেছে।’’ এই মায়ের মুখে কোনো অভিযোগ নেই, অভিমান নেই—আছে শুধুই অপেক্ষা আর ভালোবাসা। তিনি এখনও ভাবেন, তাঁর ছেলেরা হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবে, তাঁকে আবার ঘরে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবটা আরও কঠিন। ছেলেরা নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে এতটাই ব্যস্ত যে, মায়ের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ মা কি শুধুই বোঝা? চার ছেলের নিষ্ঠুরতা দেখে স্তব্ধ দেশ!
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি পরিবারের নয়, বরং এটি সমাজের এক করুণ বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সন্তানদের দায়িত্ববোধ আর মূল্যবোধ যদি এভাবে লোপ পেতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কত মা-বাবাকে এমন পরিণতির শিকার হতে হবে? বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে ফেলে যাওয়ার মানসিকতা কি সমাজের এক নতুন প্রবণতা হয়ে উঠছে? রেখা দেবীর মতো আরও কত বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন, কেউ কি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে?





