ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচন ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজ্য রাজনীতির নজর ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই কেন্দ্রের দিকে। দীর্ঘদিন ধরে ভোট সন্ত্রাস, বুথ দখল, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং জোর করে ভোট করানোর অভিযোগে বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে ফলতা। সেই কারণেই এবারের পুনর্নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। সকাল থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হতেই বহু ভোটারের মুখে শোনা গেল একটাই কথা “এবার অন্তত নিজের ভোটটা নিজে দিতে পারলাম।” আর সেই আবহেই কার্যত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান, যাঁর দেখা মিলল না গোটা ভোটের দিনেই।
সকাল থেকেই ফলতার বিভিন্ন বুথে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়, সকাল ন’টা পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। প্রশাসনের তরফে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে প্রতিটি বুথে। কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের উপস্থিতিতে ভোটপর্ব শান্তিপূর্ণভাবেই এগোতে থাকে। অনেক সাধারণ ভোটার দাবি করেন, অতীতে ভোট দিতে এলেও নানা বাধার মুখে পড়তে হত তাঁদের। কেউ বুথে পৌঁছতে পারতেন না, আবার কেউ অভিযোগ করতেন যে ভোট না দিয়েও তাঁদের আঙুলে কালি লাগিয়ে দেওয়া হত। ভোটের আগের রাতে এলাকায় ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া বা বাড়ি বাড়ি চাপ তৈরির অভিযোগও ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু এবারের ছবিটা অনেকটাই আলাদা বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের অনুপস্থিতি। ভোটের মাত্র দু’দিন আগে তিনি প্রকাশ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন। যদিও মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় ইভিএমে তাঁর নাম থেকেই গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ফলতার ভোট ঘিরে এতদিন যে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল জাহাঙ্গীরের, এবার তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা গেল। ভোটের দিন সকালে তাঁর বাড়ি বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় তৃণমূল কার্যালয়ের শাটারও নামানো ছিল বলে অভিযোগ। বারবার ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া মেলেনি। ফলে এলাকায় জোর চর্চা শুরু হয় যে, একসময় যাঁর নাম শুনলেই বিরোধীরা অভিযোগ তুলতেন ‘চাপের রাজনীতি’র, সেই নেতা এবার ভোটের দিনেই কার্যত অদৃশ্য।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পুনর্নির্বাচন শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রের ভোট নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলেরও এক বড় পরীক্ষা। বিরোধীদের দাবি, এতদিন ফলতায় সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন না। তাই এবারের ভোটকে তাঁরা “স্বাভাবিক ভোটের প্রত্যাবর্তন” হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছেন। অনেক ভোটারও জানিয়েছেন, বহু বছর পর তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বুথে এসে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরেছেন। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন এলাকা ছেড়ে বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। এবারের ভোটের আবহ বদলাতেই তাঁরা বাড়ি ফিরেছেন।
এই আবহে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডাও আত্মবিশ্বাসী সুরে দাবি করেছেন, গোটা ভোটপর্ব অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। তাঁর কথায়, অতীতে যেসব অভিযোগ উঠত ইভিএমে কারচুপি, ভোটারদের পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া বা বুথের বাইরে ভয় দেখানো এবার তার কোনও চিহ্ন নেই। তিনি আরও দাবি করেন, বহু মানুষ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন যে প্রায় এক দশক পরে তাঁরা নিজেদের ভোট নিজেরা দিতে পেরেছেন। বিজেপি প্রার্থীর অভিযোগ, বহু বুথে তৃণমূলের এজেন্টও দেখা যায়নি। অন্যদিকে সিপিআইএমের উপস্থিতিও ছিল খুব সীমিত। ফলে বিরোধী শিবিরের দাবি, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে ভোট এবার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এবং স্বাভাবিক পরিবেশেই হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ‘তোমার জায়গাটা এখনও ফাঁকা…’ বিশেষ দিনে কাকে স্মরণ করে হঠাৎ আবেগে ভাসলেন, ‘পরিণীতা’র দাপুটে খলনায়িকা রূপসা চট্টোপাধ্যায়?
ফলতার পুনর্নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ থাকলেও দিনের শেষে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। সকাল থেকেই নারী, প্রবীণ এবং প্রথমবারের ভোটারদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বলছেন, শান্তিপূর্ণ ভোটই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই কারণেই এবারের ফলতার ভোট শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভিযোগ আর আতঙ্কের আবহ কাটিয়ে মানুষের ‘স্বাভাবিক ভোটাধিকার’ ফিরে পাওয়ার প্রতীক হিসেবেও উঠে আসছে। এখন নজর থাকবে ফল প্রকাশের দিকে। কারণ এই পুনর্নির্বাচনের ফল শুধুমাত্র একটি আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে না, বরং আগামী দিনে রাজ্যের ভোট রাজনীতিতেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।






