পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বহুদিনের। রাজ্যের উন্নয়নের প্রশ্নে শিল্প বিনিয়োগকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের বক্তব্যে। বিশেষ করে রাজ্যের যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে টাটা গোষ্ঠীর নাম এবং সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের প্রসঙ্গ উঠলেই অবধারিতভাবে ফিরে আসে হুগলির সিঙ্গুরের নাম। ২০০৬ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি ‘ন্যানো’-র কারখানা তৈরির জন্য প্রায় ৯৯৭ একর উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হয়। সেই সময় প্রায় ১৩ হাজার কৃষক এই জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়েন বলে জানা যায়। জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলন এবং অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরতের দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলন, অনশন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে প্রকল্পটি বড় ধাক্কা খায়।
পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠায় টাটা মোটরসের পক্ষ থেকে কারখানা নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর রতন টাটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে সিঙ্গুর থেকে ন্যানো প্রকল্প সরিয়ে নেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে তা গুজরাটের সানন্দে স্থানান্তরিত হয়। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকার কৃষকদের জমি ফেরানোর জন্য আইন প্রণয়ন করে এবং শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট জমি অধিগ্রহণকে বেআইনি ঘোষণা করে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ফলে সিঙ্গুর একদিকে যেমন কৃষক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে, অন্যদিকে শিল্প হারানোর ঘটনাও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সিঙ্গুরে শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, টাটা গোষ্ঠীকে রাজ্যে ফিরিয়ে আনতে সরকার সবরকম চেষ্টা করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষকদের চোখের জল ফেলে বা জোর করে জমি অধিগ্রহণ করে শিল্প গড়ার নীতি তাঁদের নয়। বরং শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তিনি নিজে টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। যদি টাটারা সিঙ্গুরে কারখানা স্থাপন করতে চান, তবে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে এবং সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বিনিয়োগের নতুন পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকেই সরকার অগ্রাধিকার দিতে চায়।
আরও পড়ুনঃ শুটিং সেটে জোর করে চুমু, তারপর যা করলেন নায়ক… সদ্য সেরেছেন বাগদান, সেই সহ-অভিনেতাকে নিয়ে শারী’রিক নি’র্যাতনের বি*স্ফোরক অভিযোগ টেলিভিশন অভিনেত্রীর!
এদিকে এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছেন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। সংবাদমাধ্যমে তিনি দাবি করেছেন যে, ২০২৬ সালে সরকার গঠনের পর টাটা গোষ্ঠীর সিঙ্গুরে প্রত্যাবর্তন প্রায় নিশ্চিত। তাঁর কথায়, “আমি নিশ্চিন্তের সঙ্গে বলতে পারি, টাটা ফিরছে এবং নিশ্চয়ই সিঙ্গুরেই ফিরছে।” যদিও টাটা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি, তবুও শিল্পায়নের প্রশ্নে সিঙ্গুর আবারও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একসময় যে সিঙ্গুর শিল্প বনাম কৃষি বিতর্কের প্রতীক ছিল, ভবিষ্যতে সেই সিঙ্গুরই পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।






