পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অসন্তোষ ও মতবিরোধের খবর সামনে আসছে, অন্যদিকে বিরোধীদের সঙ্গে সংঘাতও বাড়ছে। এই আবহেই সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দল ভাঙার চেষ্টা, বিধায়কদের উপর চাপ সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় সংস্থার ব্যবহার থেকে শুরু করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার ঘটনা সবকিছু নিয়েই সরব হতে দেখা গেল তাঁকে।
সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দলের ডাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বহু বিধায়কের অনুপস্থিতি শাসকদলের অন্দরের অস্বস্তিকে আরও স্পষ্ট করেছে। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, বিভিন্ন তৃণমূল বিধায়ককে নানাভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং দল ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রথমে প্রশাসনিক স্তর থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে, তারপর রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চলছে। এমনকি কয়েকজন বিধায়ক ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ করেছেন বলেও জানান তিনি। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তৃণমূল নেত্রী।
দলের ভিতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষের আবহ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে প্রভাবিত করে বা দলবদল করিয়ে তৃণমূলকে দুর্বল করা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক চাপ, অর্থের প্রলোভন কিংবা ভয় দেখানোর কৌশল কোনওটাই বাংলার মানুষের মনোবল ভাঙতে পারবে না। তিনি দাবি করেন, যত বাধাই আসুক না কেন, তৃণমূল কংগ্রেস আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে ছাত্র-যুব সমাজের উদ্দেশেও বার্তা দেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যা ও ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হওয়ার আহ্বান জানান। নিজের ছাত্র আন্দোলনের দিনের স্মৃতিও তুলে ধরে তিনি বলেন, সমাজে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করাই গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তি।
লাইভ বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তাঁর দাবি, তৃণমূলের বহু পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে, কর্মীদের উপর হামলা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন তিনি। কয়েকটি বিধানসভা আসনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতার দাবি, ভোট গণনার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ফলাফল বদলে দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও নতুন প্রমাণ প্রকাশ করেননি, তবুও তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার পরিবর্তে বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুনঃ টলিউডের চার তারকা বিধায়ক, তবু মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন না কেউ! তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর ঘিরে বাড়ছে জল্পনা! হঠাৎ ‘ওয়েটিং লিস্টে’ কেন রুপা, রুদ্রনীল, হিরণরা?
সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে বিক্ষোভ ও হামলার ঘটনাও এদিনের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে বাইরে থেকে লোক আনা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। পাশাপাশি শিক্ষা, চাকরি ও ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। আরজি কর আন্দোলন থেকে শুরু করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় নিজের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মমতা বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য। সব মিলিয়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট, বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য যে আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উস্কে দেবে, তা বলাই বাহুল্য।






