টলিউডে অশান্তির আবহ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। একের পর এক গিল্ডকে ঘিরে প্রকাশ্যে আসছে মতবিরোধ, নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর। ম্যানেজার গিল্ড থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরদের সংগঠন, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে ইম্পা। সংগঠনের প্রকৃত সভাপতি কে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। একদিকে শতদীপ সাহা দাবি করেন, রতন সাহা নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যদিকে পিয়া সেনগুপ্ত শিবিরের বক্তব্য, বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বহাল রয়েছে। বিষয়টি আদালতে পৌঁছনোর পর স্বাভাবিকভাবেই ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
এই পরিস্থিতিতে টলিউডের বাস্তব অবস্থা বুঝতে এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য জানার উদ্যোগ নেয় নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে চার তারকা বিধায়ককে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই তালিকায় ছিলেন পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীল ঘোষ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়। শিল্পী, কলাকুশলী এবং টেকনিশিয়ানদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে কাজের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল, ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কাজের সুযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। সেই সব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতেই এই চার বিধায়ককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। লোক ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ নেন। রাজ্যপাল আর এন রবি তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান। নতুন মন্ত্রিসভায় ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, ৩ জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী জায়গা পেয়েছেন। তবে শপথ অনুষ্ঠানের পর রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে অন্য একটি বিষয়। টলিউডের পরিচিত চার বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে কেউই মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। ফলে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, গত কয়েক মাসে টলিউডের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল এই চার বিধায়ককে। রুদ্রনীল ঘোষ একাধিকবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে গিয়ে অভিযোগ শুনেছেন এবং সেই সংক্রান্ত নথিও তৈরি করেছেন বলে জানা যায়। পাপিয়া অধিকারীও শিল্পীদের সঙ্গে বৈঠক করে নানা সমস্যার কথা শুনেছেন। কাজ না পাওয়া কিংবা কার্যত ব্যানড হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলা শিল্পীদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন। হিরণ চট্টোপাধ্যায়কে তথ্য ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হিরণ বলেছিলেন, “তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের কাজকে শুধুমাত্র টলিউডের গণ্ডিতে আটকে দেখলে ভুল হবে। এই দফতরের আওতা অনেক বড়। চলচ্চিত্র তার একটি অংশ মাত্র।” তিনি আরও জানান, যে সমস্যাগুলি তিনি চিহ্নিত করেছেন, সেগুলি তিনি মুখ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরেছেন।
আরও পড়ুনঃ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার অভিযোগেই শুরু সই-কাণ্ডের তদ*ন্ত, তারপরই তৃণমূল থেকে বহিষ্কা’র! দুই বিধায়ক কি দলবি’রোধী, নাকি ফাঁ’স হতে চলেছে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক রহ’স্য?
তাহলে এত কাজের পরেও কেন টলিউডের কোনও মুখ মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন না? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এর পেছনে রয়েছে শিল্প ও প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে অতীতের নানা বিতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরকে ঘিরে থ্রেট কালচার, তোলাবাজি এবং বিভিন্ন সংগঠনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো এবার সরকার অন্য পথে হাঁটতে চাইছে। অনেকের মতে, টলিউডের কোনও পরিচিত মুখকে মন্ত্রী করলে শিল্পের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারত। তাই সরকার এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারে, যিনি সরাসরি চলচ্চিত্র জগতের অংশ নন। তবে রুদ্রনীল, হিরণ, পাপিয়া এবং রূপার ভূমিকা যে শেষ হয়ে যায়নি, তা স্পষ্ট। এখন সকলের নজর মন্ত্রক বণ্টনের দিকে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে যায়, সেটাই আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।






