আরজি কর কাণ্ডে ফের নতুন করে চর্চায় উঠে এল নির্যাতিতার পরিবারের বিচার আন্দোলন। বিধায়ক হিসেবে শপথ গ্রহণের দিনই শিয়ালদা আদালতে পৌঁছে গেলেন অভয়ার মা তথা বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। আদালতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় শুধুমাত্র সঞ্জয় রায় নয়, আরও তিন জনের যোগ থাকতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ। সেই কারণেই আদালতে একটি ‘পুট আপ’ জমা দিয়ে তিন সন্দেহভাজনের গ্রেফতারির দাবি তুলেছেন তিনি। শপথ অনুষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের আগেও মেয়ের বিচারের লড়াইকেই অগ্রাধিকার দেওয়ায় ফের একবার সামনে এল তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের বার্তা।
বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নবনির্বাচিত বিধায়কদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল। বিজেপির টিকিটে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়া রত্না দেবনাথেরও এদিন শপথ নেওয়ার কথা। কিন্তু বিধানসভায় যাওয়ার আগে তিনি ছুটে যান শিয়ালদা আদালতে। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “আমরা কোর্টে একটা পুট আপ দিয়েছি। তাই এসেছি এখানে। তিন জন সন্দেহভাজন। সেই তালিকা দিয়েছি আমরা।” যদিও ওই তিন ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে আনেননি তিনি। তবে তাঁর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় আরও বড় কোনও চক্র কাজ করেছে বলেই এখনও বিশ্বাস করে পরিবার।
আর জি কর কাণ্ডের পর প্রায় দু’বছর কেটে যেতে চলেছে। এই মামলায় সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাও দেওয়া হয়েছে। তদন্তে কলকাতা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই দু’পক্ষই সঞ্জয় রায়কেই মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু শুরু থেকেই নির্যাতিতার পরিবার দাবি করে এসেছে, এত বড় এবং নৃশংস ঘটনা একার পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয়। তাঁদের অভিযোগ, এই ঘটনার নেপথ্যে আরও কয়েক জন জড়িত রয়েছে এবং সেই দিকটি ঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি।
রত্না দেবনাথ ও তাঁর স্বামী একাধিকবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাঁরা এখনও মেয়ের মৃত্যুর পূর্ণ বিচার পাননি বলে মনে করেন। আদালতের রায়ে সঞ্জয়ের সাজা হলেও পরিবারের প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সেই কারণেই তাঁরা বিচার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিনও আদালতে দাঁড়িয়ে রত্না আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “মেয়ে আমার গোটা পৃথিবী ছিল। গোটা পৃথিবী অন্য দিকে গেলেও, আমার এই জায়গাটা থাকবে। মেয়ের জন্য অন্তত।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে আবেগ তৈরি হয় আদালত চত্বরে উপস্থিত বহু মানুষের মধ্যেও।
মেয়ের বিচারের দাবিকেই সামনে রেখে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রত্না দেবনাথ। বিজেপির প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ার সময়ও তিনি জানিয়েছিলেন, বিচার পেতে গেলে হাতে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই সক্রিয় রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও তাঁর অবস্থানে কোনও বদল আসেনি বলেই এদিনের পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের আগে আদালতে গিয়ে বিচার আন্দোলনের বার্তা দেওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
আরও পড়ুনঃ “শুধু দেশবাসীকে উপদেশ নয়, নিজেও পথে নামলেন মোদী” নিজের কনভয়ের ৫০ শতাংশ গাড়ি কমানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর, বাড়ছে ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহারও, কনভয়ে কাটছাঁটের নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও!
আরজি কর কাণ্ড নিয়ে এখনও রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। বিরোধীরা বারবার দাবি তুলেছে, এই ঘটনার পূর্ণ সত্য সামনে আসা প্রয়োজন। অন্যদিকে নির্যাতিতার পরিবারের বক্তব্য, তাঁরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। এদিন শিয়ালদা আদালতে রত্না দেবনাথের উপস্থিতি সেই লড়াইয়েরই আরও এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। শপথ গ্রহণের আগেও যে একজন মায়ের কাছে মেয়ের বিচারই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার, সেই বার্তাই যেন আবারও স্পষ্ট করে দিলেন তিনি।





