বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা শুধু অভিনয় করেননি—বাংলার দর্শকদের হাসিয়ে, কাঁদিয়ে হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandyopadhyay)। আজও তাঁর সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু তিনি শুধুই কি একজন কমেডিয়ান ছিলেন? নাকি তাঁর উপস্থিতি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, স্বয়ং উত্তম কুমারকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারতেন? বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এমন কিছু গল্প ছড়িয়ে আছে, যা শুনলে মনে হবে—এই মানুষটির কৌতুকের আড়ালে ছিল এক অদ্ভুত জাদু!
কৌতুকাভিনেতা মানেই কি হালকা চরিত্র? ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই তা ছিল না। তাঁর উপস্থিতি এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে, একাধিকবার বড় মাপের অভিনেতারাও তাঁর সামনে চাপা পড়ে গিয়েছিলেন। শুধু হাসির সংলাপেই নয়, তাঁর অভিব্যক্তি, সময়ের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং সাধারণ মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতাই তাঁকে অনন্য করেছিল। তাই তাঁর অভিনীত ছবিগুলো আজও দর্শকের মনে অমলিন। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—ভানুর উপস্থিতিতে কি সত্যিই উত্তম কুমারের ছবি ফ্লপ করেছিল?
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও উত্তম কুমার, এই দুই নাম বাংলা সিনেমার দুই স্তম্ভ। একদিকে উত্তম কুমার, যাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং রোমান্টিক ইমেজ তাঁকে মহানায়কের আসনে বসিয়েছে। অন্যদিকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর কমেডির অন্তরালে ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া চরিত্রের অনবদ্য প্রকাশ। কিন্তু যখন এই দুই তারকা একই সিনেমায় এলেন, তখন কি হল?
গুজব বলে, উত্তম কুমারের কিছু ছবিতে যখন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন, তখন দর্শকের আকর্ষণ নায়কের দিকে না গিয়ে বেশি ঝুঁকেছিল ভানুর দিকেই! ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (1953) সিনেমার কথাই ধরা যাক। সেখানে ভানুর ‘মেসোমশাই’ চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, উত্তম কুমারের প্রেমকাহিনীকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। এমনকি শোনা যায়, পরে উত্তম কুমার নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভানুর উপস্থিতি এতটাই শক্তিশালী যে, সেটাকে সামলানো কঠিন!
সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ভানুর। তিনি ছিলেন বাস্তব চরিত্রের প্রতিনিধি। তাঁর সংলাপ, ভঙ্গিমা, উচ্চারণ সব কিছুই যেন মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনের প্রতিচ্ছবি। উত্তম কুমারের রোমান্স, মার্জিত সংলাপ, অভিজাত ভাব মানুষের মন জয় করলেও, ভানুর চরিত্ররা যেন রোজকার জীবনের অংশ হয়ে উঠত। এই কারণেই হয়তো দর্শক অনেক সময় ভানুর দিকেই বেশি আকৃষ্ট হতেন। তবে কি উত্তম কুমারের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা ভানুর জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল না? অবশ্যই ছিল। কিন্তু ভানু কখনও মহানায়কের প্রতিদ্বন্দ্বী হননি, বরং নিজের জায়গায় থেকে দুর্দান্ত কাজ করে গিয়েছেন। এমনকি ‘বসু পরিবার’ (1952), ‘অভিযান’ (1962) কিংবা ‘ঢাকায় কী লন্ডনে’ (1958)-র মতো ছবিতেও ভানুর চরিত্র দর্শকের মনে গেঁথে গেছে।
আরও পড়ুনঃ ৯৫ পয়সার দম্ভ! Republic TV-র সাংবাদিকের ক্যাব চালককে হেনস্থা, ভিডিও ফাঁস হতেই চরম সমালোচনা
বাস্তব সত্যি হল, উত্তম কুমারের ছবি কখনওই শুধুমাত্র ভানুর উপস্থিতির জন্য ফ্লপ করেনি। বরং সিনেমার গল্প, পরিচালনা বা অন্যান্য কারণই ফ্লপের মূল কারণ ছিল। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, কিছু ক্ষেত্রে ভানুর চরিত্র এতটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠত যে, দর্শকের মনোযোগ টেনে নিত। কিন্তু সেটাকে প্রতিযোগিতা বলা যাবে না, বরং বলা যায়—এটা ছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ আকর্ষণ! আজও বাংলা সিনেমা তাঁর অভাব পূরণ করতে পারেনি। তাঁর সংলাপ, তাঁর চরিত্রায়ণ, তাঁর উপস্থিতি—সবটাই এক অনন্য ধারা তৈরি করেছিল। তাই উত্তম কুমারের মতো মহানায়ক থাকলেও, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও তাঁর ছায়ায় হারিয়ে যাননি। বরং নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করেছিলেন, যা আজও দর্শকের মনে অক্ষয়!





