একটি শিশুর প্রাণের মূল্য কত? একটা চিপসের প্যাকেটের মূল্যই কি তার চেয়ে বড়? বারো বছরের একটি প্রাণ আর ফিরবে না, কিন্তু রেখে গেল এমন কিছু প্রশ্ন, যা উত্তর খুঁজছে প্রতিটি মন। হাওয়ায় উড়ে আসা একটুকরো চিপসের প্যাকেট নিয়ে শুরু হওয়া ঘটনায় এখন রং বদলাচ্ছে বহু দিক। পাঁশকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই ট্র্যাজেডি যেন আজ বাংলার হাজারো মায়ের চোখে জল ঝরিয়ে দিচ্ছে।
বারো বছরের একটি ছেলে, স্কুল শেষে বাড়ি ফেরা, মাঝে একটু খিদে পেলে চিপস কিনতে গিয়েছিল। সাধারণ এই দৃশ্য বাংলার প্রতিটি গ্রামে প্রতিদিন দেখা যায়। কিন্তু সেই দিনটা আর পাঁচটা দিনের মতো ছিল না। সেই দিনের সন্ধ্যা যেন কৃষ্ণেন্দুর পরিবারের কাছে রূপ নেয় চিরকালীন অভিশাপে। এখনও মায়ের কাঁধে মাথা রেখে পড়ে আছে সেই পুরোনো সাইকেল, পড়ে আছে অর্ধেক লেখা খাতা, যেখানে পাতাগুলো আর উল্টে যাবে না। আর ঘরের কোণ থেকে বারবার শোনা যায় একটাই আকুতি—“মা, আমি চুরি করিনি”।
স্থানীয় একটি দোকানে চিপস কিনতে গিয়েছিল কৃষ্ণেন্দু। দোকান খোলা থাকলেও দোকানদার ছিলেন না। হাওয়ায় উড়ে আসা একটি প্যাকেট তুলে সাইকেলে চাপল সে। এরপরই অভিযোগ, দোকানদার তথা সিভিক ভলান্টিয়ার শুভঙ্কর দীক্ষিত ওই নাবালককে চোর অপবাদ দেন প্রকাশ্যে। শিশুর মা এসে ছেলেকে শাসনও করেন। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে কৃষ্ণেন্দু। বাড়ি ফিরে সে বিষ খায়, আর রেখে যায় একটি সুইসাইড নোট—“মা, আমি চুরি করিনি…”। এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। তবে এখানেই শেষ নয়, পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে এরপর।
শিশুটির মা সুমিত্রা দাস বলেন, পুলিশ নাকি দেহ নিয়ে তাড়াহুড়ো করছিল সৎকারের জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, “পুলিশ বলেছে, দেহ দাহ করো, না হলে নদীতে ভাসিয়ে দেব অথবা মর্গে নিয়ে চলে যাব।” এমনকি দেহ দেখার সময়ও দিতে চায়নি তারা। পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিপেটার অভিযোগও উঠেছে সেদিন গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করলে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে আক্রমণ চালায় বলেও অভিযোগ।
আরও পড়ুনঃ Indian economy : অর্থনীতির ইতিহাসে নয়া অধ্যায়! ভারতের জিডিপি ছুঁল ৪ ট্রিলিয়ন, টপকাল জাপানকেও!
তমলুক মহকুমার পুলিশ আধিকারিক আফজাল আবরার বলেন, “মৃতের মায়ের বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বলা হয়েছিল সৎকার করুন, নচেৎ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, একজন সিভিক ভলান্টিয়ার কীভাবে এত ক্ষমতা দেখাতে পারে? কিশোরের মৃত্যু, জনতার ক্ষোভ, পুলিশের ভূমিকা—সব মিলিয়ে গোটা ঘটনায় উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। তবে কৃষ্ণেন্দুর পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে, খুব শীঘ্রই থানায় অভিযোগ জানাবেন তাঁরা। শিশুর মৃতদেহ, মা-র কান্না আর ভাঙা সাইকেল—এই ত্রয়ী যেন সমাজের বিবেককে আরেকবার নাড়া দিয়ে গেল।






