যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত সমাবর্তনের দিনটি আনন্দ, গর্ব আর স্মৃতির। কিন্তু এবছর সেই আবহে হঠাৎই ঢুকে পড়ে এক অস্বস্তিকর বিতর্ক। ডিগ্রি গ্রহণের শেষ মুহূর্তে ভেসে ওঠা একটি পোস্টার—‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামফোবিয়ার কোনও জায়গা নেই’—নতুন করে প্রশ্ন তুলে দেয় ক্যাম্পাসের ভেতরের এক পরীক্ষাকেন্দ্রিক ঘটনার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায়।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েকদিন আগের এক পরীক্ষাকে ঘিরে। অভিযোগ, স্নাতকের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার সময় সন্দেহের ভিত্তিতে দুই ছাত্রীকে তাঁদের হিজাব খুলতে বলা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইংরেজির স্নাতকোত্তরের প্রথম বর্ষের দুই পড়ুয়া সমাবর্তনের মঞ্চে নীরব প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পরীক্ষার হলে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। ধীরে ধীরে বিষয়টি ‘হিজাব বিতর্ক’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং ইসলামফোবিয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
তবে শিক্ষকদের বক্তব্যে ধরা পড়ে ভিন্ন ছবি। কয়েকজন অধ্যাপক স্পষ্টভাবে জানান, পরীক্ষার হলে সাম্প্রতিক সময়ে চিটিং সংক্রান্ত একাধিক ঘটনা ধরা পড়েছে। তাঁদের দাবি, হেডফোন ব্যবহার করে নকল করার অভিযোগে গত সপ্তাহেই অন্তত চারজন পরীক্ষার্থীকে ধরা হয়, যাঁরা কেউই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নন। এমন পরিস্থিতিতে নজরদারি কঠোর করা হয়। কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে পুনরায় পরীক্ষা করা হয়—এটাই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য, কোনও ধর্মীয় পরিচয় নয়।
এক অধ্যাপক আরও জানান, ওই পরীক্ষার দিন হিজাব পরেই একাধিক ছাত্রী পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের কারও ক্ষেত্রে কোনও আপত্তি তোলা হয়নি। এমনকি বিশেষভাবে সক্ষম এক পড়ুয়াও হিজাব পরে লাইব্রেরিতে পরীক্ষা দেন, সেখানেও কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। শিক্ষকদের মতে, নির্দিষ্ট একটি ঘটনাকে আলাদা করে ধর্মীয় রঙ দেওয়া হচ্ছে, যা তাঁদের পেশাগত সম্মান ও কাজের পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। কারও কারও কণ্ঠে হতাশা—এই ভাবে শিক্ষকদের টার্গেট করা হলে পড়াশোনার পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরও পড়ুনঃ Hindu Heritage : “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নাকি শক্তি প্রদর্শন?” বিষ্ণু মূর্তি ভাঙার ঘটনায় থাইল্যান্ডকে কড়া বার্তা ভারতের!
পুরো বিষয়টি নিয়ে আপাতত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের পাঠানো চিঠির প্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বিস্তারিত বিবৃতি না এলেও প্রশাসনের তরফে আশ্বাস, কোনও অভিযোগই হালকাভাবে দেখা হবে না। প্রশ্ন একটাই—এই বিতর্ক কি পরীক্ষার স্বচ্ছতা বনাম ব্যক্তিগত অধিকারের সংঘাত, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও গভীর কোনও অসন্তোষ? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে যাদবপুর।






