দাদু ছিলেন অন্যতম নামী ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা, আত্মীয় ছিলেন বিমল রায় থেকে শুরু করে ধর্মেন্দ্র! প্রচুর সম্পত্তি, সত্যজিৎ-প্রেম থেকেই বিনোদন জগতে পা রাখা! অনীক দত্তের জীবন যেন সিনেমারই মতো!

বাংলা সিনেমার জগতে অনীক দত্ত ছিলেন একেবারে আলাদা ঘরানার পরিচালক। ব্যঙ্গ, রসবোধ আর সমাজের নানা অসঙ্গতিকে নিজের ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতে তিনি বরাবরই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তির পর থেকেই দর্শক বুঝে গিয়েছিলেন, বাংলা সিনেমায় নতুন ধরনের গল্প বলার মানুষ এসেছেন। তবে শুধুই পরিচালক হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা, পারিবারিক ঐতিহ্য সব মিলিয়েও অনীকের জীবন ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। তাঁর চলে যাওয়ার পর তাই নতুন করে সামনে আসছে তাঁর জীবনের নানা অজানা অধ্যায়।

কলকাতাতেই জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা অনীকের। প্রথমে পাঠভবনে পড়াশোনা, পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক হন তিনি। সিনেমায় আসার আগে দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর সিনেমার ভাবনায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। খুব কম ছবি পরিচালনা করলেও প্রতিটি কাজেই নিজের স্বতন্ত্র ভাবনা স্পষ্ট করে গিয়েছেন তিনি। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘অপরাজিত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ কিংবা ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ প্রত্যেকটি ছবিতেই সমাজ ও সময়কে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা ছিল। তাঁর কাজের খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে মজার ছলে অনেকেই তাঁকে ‘প্যানিক দত্ত’ বলেও ডাকতেন।

পারিবারিক দিক থেকেও অনীক ছিলেন অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। তাঁর দাদু নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত ছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আবার কিংবদন্তি পরিচালক বিমল রায়ের পরিবারের সঙ্গেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তাঁদের। সেই সূত্রেই বলিউড অভিনেতা ধর্মেন্দ্র ও দেওল পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল অনীকের। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি আড্ডাপ্রিয়, রসবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে, চা খেতে এবং সিনেমা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতে খুব ভালোবাসতেন। তবে কাছের মানুষদের দাবি, জীবনের শেষ দিকে ধীরে ধীরে একাকিত্ব তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।

অনীক দত্ত বরাবরই প্রতিবাদী মানসিকতার মানুষ ছিলেন। কোনও বিষয় অন্যায় মনে হলে সরাসরি মত প্রকাশ করতে দ্বিধা করতেন না। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক নানা ইস্যুতে অতীতেও তিনি সরব হয়েছেন। তাঁর ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবি ঘিরেও একসময় বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আবার ‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের জীবনের অনুপ্রেরণায় তৈরি গল্পকে নিজের মতো করে বড়পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেই ছবির মাধ্যমেই অভিনেতা জিতু কমল নতুনভাবে পরিচিতি পান দর্শকদের কাছে। অনীকের সিনেমা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারে আলাদা, আর সেই কারণেই বাংলা ছবির ভিড়ে তিনি নিজের জায়গা আলাদা করে তৈরি করতে পেরেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গাইতে গাইতে কা’ন্নায় ভেঙে পড়লেন মেয়ে, ঐশীর কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে পঞ্চভূত বিলীন অনীক দত্ত! আ’ত্মহ’ত্যার আগে একমাত্র কন্যার জন্য চিঠিতে কী লিখে গিয়েছেন বাবা?

পরিচালকের শেষ কয়েকটি পরিকল্পনাও ছিল বেশ বড় মাপের। জানা গিয়েছে, তিনি সলিল চৌধুরীর জীবন নিয়ে ছবি বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি ‘অপরাজিত ২’-এর ভাবনাও নাকি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সব পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হল না। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলা সিনেমা জগতকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বাংলা সিনেমায় যে ধরনের ব্যঙ্গাত্মক অথচ বুদ্ধিদীপ্ত ছবি তিনি তৈরি করতেন, সেই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। পরিচালক হিসেবে নয়, একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবেও অনীক দত্ত দীর্ঘদিন মনে থেকে যাবেন দর্শকদের কাছে।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

আরও অন্যান্য খবর