দেশজুড়ে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন পাঞ্জাবে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ফের সেই প্রশ্নকেই সামনে এনে দিয়েছে। কর্মস্থল, যা সাধারণত নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানেই এক তরুণীকে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক কোপ মেরে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক তথা সহকর্মীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে ঘিরে শুধু মানবিক ক্ষোভই নয়, পাঞ্জাবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টি (AAP) সরকারের আমলে নারী নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে পাঞ্জাবের মোহালির একটি বেসরকারি সংস্থার অফিসে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত তরুণীর নাম ডিম্পল (৩০)। অভিযুক্তের নাম হরজিন্দর সিং মান ওরফে হ্যারি (৩৯)। দু’জনেই একই বেসরকারি কুরিয়ার সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। কর্মক্ষেত্রেই তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে কিছুদিন আগে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, বিচ্ছেদ মেনে নিতে না পেরেই এই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে অভিযুক্ত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, ডিম্পল নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিলেন। সেই সময় পিছন দিক থেকে এসে হঠাৎই তাঁর উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হরজিন্দর। অভিযোগ, একবার নয়, বারবার আঘাত করা হয় তরুণীকে। সহকর্মীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। অফিসের মধ্যেই আতঙ্ক ও চিৎকারের পরিবেশ তৈরি হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ডিম্পলের উপর হামলা চালানোর পর অভিযুক্ত নিজেও একই অস্ত্র দিয়ে নিজের গলায় আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দু’জনকেই উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে চিকিৎসকেরা ডিম্পলকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযুক্ত বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ এবং খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ডিম্পলের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছিল হরজিন্দর। কিন্তু তাতে রাজি ছিলেন না তরুণী। এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল বলে জানা গিয়েছে। পুলিশের মতে, সেই ক্ষোভ ও মানসিক অস্থিরতা থেকেই এই হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর থেকেই পাঞ্জাবে নারী নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ রুখতে সরকার যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। তাঁদের প্রশ্ন, যদি একটি অফিসের মতো কর্মক্ষেত্রেও একজন মহিলা নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টির সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের নেতৃত্বে সরকার একাধিক উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরলেও বিরোধীরা বারবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। সম্পর্ক ভাঙার পর প্রতিহিংসা, নারীদের প্রতি অধিকারবোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলিও সমাজের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলে নতুন সমীকরণ! শীঘ্রই গ্রেফতার হতে পারেন অভিষেক? সেই জন্যই কি এত বড় সিদ্ধান্ত নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
মোহালির এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, নারী নিরাপত্তা নিয়ে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপই সবচেয়ে জরুরি। একজন তরুণী নিজের কর্মস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন, আর সেই ঘটনার নৃশংসতা দেখে শিউরে উঠেছে গোটা দেশ। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্ত ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।






