আমাদের বাংলায় কত অজানা কাহিনী রয়েছে যেগুলো জানতে পারলে আমাদের নিজেদেরই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। স্বাধীনতার সময় এমন কিছু মানুষের কথা আজও অজানা রয়ে গেছে যাদের অবদান কিন্তু অনস্বীকার্য। আজকে আপনাদের এমন একজন নারীর কথা বলব যার জীবন কাহিনী শুনলে আপনাদের শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যাবে।
তিনি হলেন ঠাকুরবাড়ির হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোমেয়ে সুদক্ষিণা। যাকে উত্তরপ্রদেশে বলা হতো মুকুটহীন রানী। দোর্দণ্ড প্রতাপ ইংরেজ শাসকরা যাকে ভয় পেতেন, আজকে সেই অগ্নিকন্যার গল্প আপনাদের বলা যাক।
ঠাকুরবাড়িতে জন্মের পর বাবার ছায়া মাথার ওপর ছিল না। দাদা-দিদিদের সাহচর্যে একটু করে বড় হচ্ছিলেন সুদক্ষিণা। আরেক নাম ছিল পূর্ণিমা। তিনি ছিলেন ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষ। এছাড়া রান্নাও তিনি ভীষণ ভালো করতে পারতেন। ঠাকুরবাড়ির পূণ্য পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন রান্না সম্পর্কে। রান্নাকে তিনি একটি শিল্প মনে করতেন।
একটু বড় হতেই তার রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। একদম রাজ রানীর মত দেখতে ছিল তাকে। সত্যি জীবনে তাই হলেন। পাত্র উত্তরপ্রদেশের হরদৈ জেলার জমিদার, পণ্ডিত জ্বালাপ্রসাদ পাণ্ডে। তিনি পারিবারিক দিক থেকে জমিদার হলেও একজন আই সি এস অফিসারও ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে অত্যন্ত সুখী ছিলেন সুদক্ষিণা। ঘোড়া চালানো, জমিদারি পরিচালনা, বন্দুক ছোঁড়া, ইংরেজি ভাষা চর্চা সবকিছুই তিনি করতেন তার স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু ২৭ বছর বয়সে ঘটল অঘটন। মারা গেলেন জ্বালাপ্রসাদ পান্ডে। অকাল বৈধব্য নেমে এলো সুদক্ষিণার জীবনে।
এই পর্যন্ত পড়ে সকলেরই মনে হতে পারে এবার বোধহয় আর পাঁচটা সাধারণ বিধবার মতোই জীবন চলেছে সুদক্ষিণার। কিন্তু তিনি যে অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি শক্ত হাতে হাল ধরলেন জমিদারির।সেই সময়ে উত্তরপ্রদেশে ২৭ বছর বয়সী এক বিধবা নারী যিনি কলকাতা থেকে গেছেন তিনি একা সামলাচ্ছেন এক বিশাল রাজ্যপাট! একথা কি ভাবা যায়? কিন্তু বাস্তবে এরকমটাই হয়েছিল।
তিনি ঘোড়ায় চড়ে, হাতে বন্দুক নিয়ে জমিদারি এলাকা পরিদর্শন করে বেড়াতেন। সমস্ত অভাব-অভিযোগ শুনতেন প্রজাদের। সকলে ভেবেছিল স্বামীর মৃত্যুর পর তার বিশাল রাজ্যপাট জোর করে অধিগ্রহণ করে নেবে ব্রিটিশ সরকার। অন্তত ব্রিটিশরা সেরকমই ভেবেছিল। কিন্তু বাস্তবটা ছিল অন্য। কয়েকজন তেজস্বী ডাকাতকে নিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন তার রক্ষীবাহিনী। তার শাসনে ইংরেজ সরকার রীতিমতো পর্যুদস্ত হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশে তাকে ডাকা হতো মুকুটহীন রানী বলে। তাকে ইংরেজরা তিনবার মহারানী খেতাব দিতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব বারংবার ফিরিয়ে দিয়েছেন। আজও হয়তো উত্তর প্রদেশের হরদৈ জেলা মনে মনে স্মরণ করে এই মহীয়সী নারীকে।






