পরিচালক অনীক দত্তের জীবনে সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব কতটা গভীর, তা তিনি নিজেই সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন। আজকাল ডট ইন-কে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে অনীক জানান, ছোটবেলা থেকেই সত্যজিৎ রায়ের কাজ তাঁকে টেনেছে। তিনি বলেন, প্রথমে ইলাস্ট্রেশনের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল, পরে লেখার দিকে ঝোঁক আসে। যদিও ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ প্রথমবার দেখার সময় সেটিকে আলাদা করে সত্যজিৎ রায়ের ছবি হিসেবে ভাবেননি। পরে ধীরে ধীরে তাঁর কাজের বিস্তার এবং বৈচিত্র্য অনীককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিচালকের কথায়, সত্যজিৎ রায় এমন কোনও ক্ষেত্র ছিল না যেখানে নিজের ছাপ রাখেননি। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রনাট্য, পরিচালনা সবেতেই ছিল তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি।
সত্যজিৎ রায়ের কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনীক দত্ত বিশেষভাবে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কমেডির ক্ষেত্রেও সত্যজিৎ অনন্য ছিলেন, যার উদাহরণ ‘পরশুরাম’ বা ‘বিরিঞ্চিবাবা’। শুধু পরিচালনাই নয়, নিজের ছবির সংগীত পরিচালনাও নিজেই করতেন তিনি। তবে সত্যজিৎ রায়ের শেষ দিকের ছবিগুলো নিয়ে অনীকের আলাদা পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁর মতে, সেই সময়ের ছবিগুলোতে যেন অন্য এক সত্যজিৎকে দেখা গিয়েছে। অনীক বলেন, “হি ইজ দ্য মাস্টার বাট স্লাইটলি হ্যান্ডিক্যাপড মাস্টার।” তাঁর ধারণা, শারীরিক অসুস্থতার কারণেই সেই সময় পরিচালকের কাজে কিছু সীমাবদ্ধতা এসে গিয়েছিল। কারণ, সিনেমা তৈরি করাকে তিনি এক ধরনের শরীরচর্চার সঙ্গেই তুলনা করেছেন।
অনীক দত্তের মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণ শুধুমাত্র মানসিক কাজ নয়, এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রমও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। তিনি বলেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে অসুস্থতার কারণে সত্যজিৎ রায়কে অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই কাজ করতে হয়েছিল। তবু সেই অবস্থাতেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা কমেনি। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে যে বাস্তবতা বা রিয়েলিজম দেখা যায়, তা অনীক দত্তকে কতটা প্রভাবিত করেছে সেই প্রশ্নও ওঠে সাক্ষাৎকারে। উত্তরে তিনি জানান, সত্যজিতের ছবিতে একটি স্পষ্ট আদি, মধ্য এবং অন্ত ছিল। অর্থাৎ একটি ক্ল্যাসিক্যাল ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার মেনে গল্প এগোত। সেই গঠনকে অনুসরণ করে তিনিও এক-দু’বার ছবি তৈরির চেষ্টা করেছেন বলে জানান পরিচালক।
সাক্ষাৎকারে অনীক দত্ত ফরাসি পরিচালক জঁ লুক গোদারের প্রসঙ্গও টানেন। তিনি বলেন, একবার গোদারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সিনেমায় নির্দিষ্ট গল্পের গঠন থাকা জরুরি কি না। উত্তরে গোদার বলেছিলেন, থাকলে ভাল, তবে সবসময় তা মানতেই হবে এমন নয়। অনীক জানান, সত্যজিৎ রায়ের কাজেও বিভিন্ন নির্মাতার প্রভাব ছিল এবং তাঁর নিজের কাজেও কিছু প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাব এবং অনুপ্রেরণা একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। তবে নিজের মতো করে নির্মাণ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাকে দেখেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন বলে জানান।
আরও পড়ুনঃ “যার সৃষ্টির মাধ্যমে আমি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সম্মানিত হয়েছিলাম…” অনীক দত্তের মৃ’ত্যুতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন, বর্ষীয়ান অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়! ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির কোন স্মৃতি আজও ভোলেননি?
শুধু প্রশংসাই নয়, সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ ছবির একটি ভুল নিয়েও মন্তব্য করেন অনীক দত্ত। তিনি বলেন, ট্রেন লাইন পার হওয়ার দৃশ্যে একটি ভুল ছিল। সেখানে ট্রেনের দিক নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা অন্যরকম ছিল, কিন্তু হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে ট্রেন আসায় অপুর বিস্ময় আরও জোরালো হয়ে ওঠে। অনীকের মতে, সেই ভুলই দৃশ্যটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। তিনি আরও জানান, প্রথমবার কোনও সিনেমা দেখার সময় শুধুই দর্শক হিসেবে ছবি উপভোগ করেন। পরে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার দেখার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখেন কিংবা নোট নেন। যদিও সবসময় সচেতনভাবে বিশ্লেষণ করেন না বলেই জানিয়েছেন পরিচালক।






