ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অনন্য নাম কিশোর কুমার। তার আরও একটি জন্মদিন যেন শিল্পীকে চিরযৌবন করে দিয়ে যাচ্ছে। তার গান মানুষের মনে বেঁধে রেখেছে তাদের আবেগের সমস্ত শব্দ। তোর আনন্দের গানের মধ্যে যেমন মেতে ওঠে দেশবাসী তেমনি তার দুক্ষের সুরে চোখের জল ফেলে সকলেই।
অনুরাগীরা বলেন তিনি অত্যন্ত খামখেয়ালি ছটফটে এবং অস্থির স্বভাবের ছিলেন। যেন কিশোর কুমারের মধ্যে সর্বদাই যেন এক কিশোর বয়সে ডানপিটে ছেলে বেলা তাকে নাড়া দিয়ে গেছে।
তার বিভিন্ন আজব কান্ড কারখানা এখনো মানুষের স্মৃতির আঙিনায় ঢেউ তোলে। কখনো মঞ্চে গান গাইতে ডিগবাজি। কখনও গান রেকর্ডিংয়ের সময় অঙ্গভঙ্গি করে হাসিয়ে দিচ্ছেন সহশিল্পীকে। বাইরে থেকে আমুদে এবং কিছুটা খাপছাড়া স্বভাবের এই মানুষটার হৃদয় ছিল কিন্তু অত্যন্ত মানবিক।

শিশুসুলভ শিল্পী কিশোর কুমারের প্রতিবাদী সত্ত্বা ছিল চরম। জুন মাসের জরুরি অবস্থা জারি করেছিল তৎকালীন সরকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই জরুরি অবস্থা নিয়ে বিতর্কে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা দেশ। জরুরি অবস্থার পক্ষে সাড়া দেবার জন্য বম্বের তাবড় তাবড় শিল্পীদের সমর্থনের জন্য হাত বাড়িয়ে ছিলেন তৎকালীন সরকার। চলচ্চিত্রজগতের শিল্পীরা সকলেই মানুষের নয়নের মনি। ফলে তাদের সমর্থন সবসময়ই সরকারের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। বেশকিছু অভিনেতা শিল্পী গায়ক এই জরুরি অবস্থার পক্ষে সমর্থন জানালেও, তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বেশ কিছু জন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন কিশোর কুমার। মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নিতে পারেননি। বহু বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হলেও তার সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল।রাজনীতির মানুষ না হয়েও শিল্পীসুলভ অনমনীয় জেদে ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন তিনি।
শোনা যায় তিনি যখন স্টেজে গান করতে উঠতেন তার আগে খবর নিতেন স্টেজের মাপ টা কত বড় ? কারণ ছুটোছুটি করে দর্শকদের কাছে গান পরিবেশন করবেন। তবে তার হৃদয়ের মাপ কত বড়? তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তার বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে।
জরুরি অবস্থা চলাকালীন তিনি সরকারপক্ষের একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেলেও তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাশালী বেশ কিছু মানুষের রোষের কবলে পড়েন গায়ক।
জরুরি অবস্থা চালুর পর ‘বিশ দফা কর্মসূচি’র সমর্থনে অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে এক প্রচার-অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়। এই সময় কিশোরকুমার কে দিয়ে গান গাওয়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি।সেই সময় তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের কাছ থেকে তাকে ফোন করে অনুরোধ করা হয়, এমনকি আধিকারিকরা বাড়ি গিয়েও তার সাথে দেখা করতে চান। কিন্তু কিশোর কুমার বাড়িতে আসতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন।সে সময় কেন্দ্রে তথ্য ও সম্প্রচার দফতরের মন্ত্রী ছিলেন বিদ্যাচরণ শুক্লা।
কিশোর কুমারের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে সেই সময় রেডিওতে তার গাওয়া গান ও সিনেমার সম্প্রচার বন্ধ করার আদেশ দেওয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে। এই নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল জরুরি অবস্থার শেষ দিন পর্যন্ত।

সেই সময় আকাশবাণী ছিল প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। ফলে কিশোর কুমার কে প্রভূত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল এ কথা বলাই বাহুল্য । কিন্তু শিল্পীরা কখনো তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন না। কিশোরকুমার সেই কথাই যেন আরো একবার প্রমাণ করে দিয়েছিলেন।
শোনা যায় গানটি গাওয়ার জন্য তথ্য-সম্প্রচার দপ্তর থেকে তিনি কিশোর কুমারের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তাঁকে কিশোর কুমার বলেন, “এই গান কেন আমাকে গাইতে হবে?” উত্তরে সেই দূত তাঁকে বলেছিলেন, “মন্ত্রী চাইছেন, তাই আপনাকে গাইতে হবে।”
স্বৈরাচারী এই ক্ষমতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধেই তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।আর তাই প্রবল শক্তিশালী ক্ষমতার কাছে তিনি শিল্পী তার গান দিয়েই তিনি সমস্ত ক্ষমতার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলতে পারেন ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব…’





