বিগত কয়েকদিন ধরেই তাঁকে একাধিক ক্ষোভ, ঘৃণা, কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে। গত মঙ্গলবার কেকে-কে নিয়ে করা তাঁর কটাক্ষের জেরে জনরোষের মুখে পড়েন তিনি। সেদিনই কেকে-র মৃত্যু হওয়ায় তাঁর দিকে আসা বিতর্ক যেন আক অন্য রূপ নেয়। কেকে-কে করা তাঁর সেই অপমানের জেরে সাধারণ মানুষ থেকে নানান তারকা ক্ষোভ উগড়ে দেন তাঁর উপর। এতদিন তিনি সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়েই চলছিলেন।
তবে আজ, শুক্রবার দুপুরে নিজেই প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন সঙ্গীতশিল্পী রূপঙ্কর বাগচি। স্ত্রী চৈতালী লাহিড়ীকে পাশে নিয়ে এদিন কাগজে লেখা বিবৃতি পাঠ করেন তিনি। ঘড়ি ধরে চার মিনিট দীর্ঘ সেই বিবৃতি পড়েই উঠে চলে যান সঙ্গীতশিল্পী। সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনও প্রশ্নের উত্তরই দেন নি তিনি। কেকে-র পরিবারের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে কী লেখা পাঠ করলেন রূপঙ্কর?
“প্রথমেই প্রয়াত কেকে-রপরিবারের কাছে নিঃশর্ত দুঃখ প্রকাশ করছি। আমার যে ভিডিওটি গত ক’দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া ও তার বাইরে এত বিরামহীন উত্তেজনার উপাদান হয়েছে, এখানে পৌঁছবার আগে সেটি আমি ফেসবুক থেকে ডিলিট করলাম। পরলোকগত গায়কের পরিবারের কারোর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। কিন্তু আপনাদের মাধ্যমে তাঁদের আবার জানাচ্ছি যে, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কেকে আজ যেখানেই থাকুন ,ঈশ্বর যেন ওঁকে শান্তিতে রাখেন”।
রূপঙ্কর বলেন, “আমার সংগীত জীবনে এইরকম বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হবে ভাবিনি। যেখানে ওড়িশায় বসে করা একটা ভিডিও পোস্ট এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে যা আমার গোটা পরিবারকে ঠেলে দেবে চরম আতঙ্ক ,দুৰ্ভাবনা এবং মানসিক নিপীড়নের মধ্যে। যেখানে আমার বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা রক্ষায় পাহারা দেবে টালা থানার পুলিস। নিয়ত হুমকি এসেই যাবে আমার স্ত্রী-র ফোনে। গায়ক হিসেবে দেশে-বিদেশে এত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। তাঁদের আবেগ অনুভব করেছি এত বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে। স্বীকৃতি পেয়েছি নানান স্তরে। মুহূর্তের অসতর্কতা যে এমন গনগনে এবং মারমুখী আবেগ বয়ে আনবে কে জানতো ? এত ঘৃণা! এত আক্রোশ! এত বিরুদ্ধতা, কিন্তু অনেকটাই তৈরি হল আমার বক্তব্য আমি ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে না পারায়”।
গায়কের সংযোজন, “প্রয়াত কেকে সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কোনও বিদ্বেষ নেই। থাকার প্রশ্নও ওঠে না। আমি শুধু ওঁর কনসার্ট নিয়ে তৈরি হওয়া উন্মাদনা লক্ষ্য করে বলতে চেয়েছিলাম বাঙালি গায়কদের জন্যও আপনারা একইরকম দরদ দেখান। ব্যক্তিগত ভাবে ঈশ্বরের আশীর্বাদে এবং আপনাদের শুভেচ্ছায় গায়ক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত কোনও হতাশা নেই। কিন্তু বাঙালি গায়ক হিসেবে সমষ্টিগত বিপন্নতা রয়েছে। ইদানিং আরও বেশি করে বারবার মনে হয় দক্ষিণ বা পশ্চিম ভারতে যেভাবে তারা শিল্পীদের স্বার্থরক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ে ,আমরা যেন সেটা করতে দ্বিধাগ্রস্ত। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত সবেতেই প্রাদেশিক পারফর্মার যেন কঠিন খাদের ধারে এক অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়ে। তাই আমি একার কথা বলতে চাইনি।একটা সমষ্টির কথা বলতে চেয়েছিলাম”।
তিনি আরও বলেন, “একই সঙ্গে তাই আরও কিছু সহযোদ্ধার নাম করেছিলাম, যাদের ট্যালেন্ট আমার মতে জাতীয় পর্যায়ের। পরে মনে হয়েছে নামগুলো বলার আগে জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আবার বলি এককভাবে ইস্যুটা দেখিনি। কেকে-র মতো ভারতবিখ্যাত পারফরমারের নামটা নিছক প্রতীক ছিল। নিছক উপলক্ষ্য। লক্ষ্য খনো তিনি ছিলেন না। থাকার প্রশ্নও নেই”।
সর্বশেষে রূপঙ্কর বেশ হতাশার সঙ্গেই বলেন, “কে জানত, চরম দুর্ভাগ্য কেকে-র জন্য এইভাবে ওঁৎ পেতে রয়েছে। একজন প্রথিতযশা শিল্পী কলকাতার মঞ্চে গাইতে এসে এভাবে প্রাণ হারালেন সেটা খুব হৃদয় বিদারক। আপনাদের কাছে মার্জনা চাইছি”।






