ভাবুন তো, একটা ছোট্ট ছেলে… বাবা-মা হারা… ঠাঁই হয়েছে অনাথ আশ্রমে… আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে এসে একদিন হয়ে উঠল বাংলা সিনেমার এক উজ্জ্বল তারকা। এ কোনও সিনেমার গল্প নয়, এ বাস্তব… সুখেন দাসের গল্প।
২৮ জুলাই, তাঁর জন্মদিনে একটু ফিরে তাকানো যাক সেই জীবনের দিকে, যা সাহস আর লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
কলকাতার বউবাজারের এক পুরনো গলি—‘শ্রীনাথ দাস লেন’। এখানেই ছিল তাঁর শিকড়। সুখেনের দাদু শ্রীনাথ দাস ছিলেন এক নামজাদা আইনজীবী। দাদুর আদি বাড়ি ছিল হালিশহরে, পরে কলকাতায় এসে তৈরি করেছিলেন একের পর এক অট্টালিকা। সেই বাড়িগুলোর মধ্যে একটি দুর্গাদালান এখনও টিকে আছে, যেখানে আজও দুর্গাপুজো হয়।
কিন্তু সুখেনের জীবনে গল্পটা একটু অন্যরকম। তাঁর বাবা ফণীন্দ্রনাথ দাস নাট্যজগতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েন, একদিনে হারিয়ে ফেলেন তাঁদের নয়টি বাড়ি। এরপর একের পর এক ধাক্কায় সুখেনের মাথা থেকে সরে যায় ছাদ। মা-বাবা দু’জনেই মারা যান, আর ছোট্ট সুখেন ও তাঁর ভাইবোনেরা ঠাঁই পান এক অনাথ আশ্রমে।
কিন্তু ওই যে… সুখেন দাস! তিনি তো থেমে থাকার লোক নন! অদম্য জেদ নিয়ে একদিন আশ্রমের দেয়াল টপকে পালিয়ে যান। রাস্তাই তখন তাঁর ঠিকানা। খাবার জোটে কারও দয়া, ছোটখাটো কাজ করে। আর ঠিক তখনই ভাগ্যদেবী একটু মুখ তুলে তাকালেন—ধর্মতলার ফুটপাথে এক সদয় চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা। সেই ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ছোটখাটো কাজে যুক্ত হয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয় পেলেন সুখেন।
কিন্তু সিনেমার টান? সেটা তো রক্তে ছিল। বাবার থেকে পাওয়া। তাই সুযোগের খোঁজে স্টুডিওর গেট গেটে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তো গেটের দারোয়ানের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে গেলেন! ঠিক তখনই এলেন শব্দযন্ত্রী জে. ডি. ইরানি। ছেলেটার সাহস, কৌতূহল আর কথা বলার ঢঙ দেখে ফ্লোরে ঢুকতে দিলেন। অভিনয় করতে বললে এমনভাবে করে দেখালেন যে সবাই অবাক!
এই তো শুরু। ১৯৪৯ সালে পরিচালক দেবনারায়ণ গুপ্ত তাঁকে ‘দাসীপুত্র’ ছবিতে একটা ছোট চরিত্র দেন। বয়স তখন মাত্র এগারো! একই বছরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘কুয়াশা’ ছবিতেও শিশুনায়ক হিসেবে অভিনয় করেন।
সেখান থেকেই শুরু এক দীর্ঘ, উজ্জ্বল, সংগ্রামী যাত্রা। প্রায় আড়াইশোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। শুধু অভিনেতা নন, পরিচালক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘পান্না হীরে চুনী’, ‘সোনা বৌদি’, ‘প্রতিশোধ’, ‘স্বর্ণমহল’—বাংলার পারিবারিক মেলোড্রামার এক চেনা মুখ হয়ে ওঠেন সুখেন দাস।
তবে, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়? মানুষ সুখেন দাস। শ্যুটিং ইউনিটে সবার খাওয়া হয়েছে কি না, নিজেই খোঁজ নিতেন। নিজে খেতেন সবার শেষে। ছোটবেলার দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন তাঁকে যে শিখিয়ে দিয়েছিল—সফল হলেই মানুষ ভোলেন না, বরং তখনই আরও বেশি করে মানুষের পাশে থাকা উচিত।
অঞ্জন চৌধুরীর পাশাপাশি বাংলা সিনেমার খারাপ সময়ে তিনিও সামনে থেকে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সমালোচনা এসেছিল, তবু তিনি জানতেন, সিনেমা বানানো মানে শুধু নিজের নাম নয়—পেছনে থাকা শত-শত টেকনিশিয়ান, কলাকুশলীর রোজগার জড়িয়ে আছে এতে। তাই সিনেমা বানিয়ে গেছেন, কিন্তু শালীনতা আর রুচির জায়গায় কখনও আপোস করেননি।
আরও পড়ুনঃ Mamata Banerjee : ভোটের আগেই প্রশাসনিক সংঘাত! মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ‘ঠান্ডা হুমকি’, রাজ্যের BLO-দের কড়া জবাব!
সুখেন দাস—শুধু একটা নাম নয়, একটা সময়, একটা অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবন বলে—জেদ থাকলে, মনটায় বিশ্বাস থাকলে, অন্ধকার গলিও একদিন আলোয় ভরে ওঠে। আজ তাঁর জন্মদিনে, তাঁকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করা ছাড়া আর কিছুই কি আমরা দিতে পারি?





“হিরণের বাড়িতে দু’টো বউ, সোহমের কিন্তু একটাই বউ…” দলীয় প্রার্থীর প্রশংসা করে, বিপক্ষ তারকা প্রার্থীকে খোঁচা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের! নির্বাচনের প্রাক্কালে শাসকদল বনাম বিজেপির সংঘাতে উত্তেজনা তুঙ্গে!