বাঙালির কাছে আজও তিনি টলিউডের মহানায়ক। তাঁর প্রত্যেকটি সিনেমা থেকে তাঁর ছবিতে গাওয়া গান সকলেরই আজও মনে আছে। তাঁর এমনই প্রতিভা যে, বাঙালিকে বাধ্য করেছে তাঁকে মনে রাখতে। তাই আজও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তিনি বিরাজমান। ৩ সেপ্টেম্বর এলে টালিগঞ্জ বা আহিরীটোলায় তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করে শুধু ক্ষান্তি দেন না বাঙালি। তাঁকে মনে করে আরও নানা আয়োজন করা হয় এই বিশেষ দিনে। তাঁর অভাব অনুভব করে সমস্ত বাঙালি থেকে টলিউড। তিনি আর কেউ নয়, তিনি হলেন উত্তম কুমার।
প্রথম থেকেই তিনি নায়ক উত্তম কুমার ছিলেন না। কেরিয়ারে পরপর প্রথম ৭টি ছবি ফ্লপ হয়েছিল তাঁর। ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে “অরুণকান্তি ফ্লপ মাস্টার জেনারেল” আখ্যা দেয়। সেখান থেকে তিনি হয়ে ওঠেন নায়ক উত্তম কুমার। তারপর তাঁর শুরু হয় মহানায়কের যাত্রা। নিজের প্রতিভা দিয়ে বাঙালির মন জিতে নিয়েছিলেন মহানায়ক। আজও বাঙালি তাঁর অভিনয়ে মজে। প্রথমদিকে তাঁর এই প্রতিভায় খামতি ছিল। সংলাপ ঠিকমত বলতে পারতেন না। দেহসৌন্দর্য তেমন কিছু ছিল না। অতি সাধারন মানের মেকআপ করা হত তাঁর। অনেক লোকের কাছেই হেওর পাত্র হয়েছেন মহানায়ক।
কিন্তু সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ তিনি সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছেন। প্রতিভার সঙ্গে তিনি খেটেছেনও দুর্দান্ত। নিজেকে এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে যেতে খেয়াল দিয়েছেন নিজের প্রতি। ১৯৯৫ সালের পূর্ব আর পরবর্তী উত্তমকুমারকে মেলানো একদমই সম্ভব নয়। ১৯৬০-এর উত্তম এক অনন্য। ১৯৬৫’র পর্বে উত্তম কুমার পুরো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ততদিনে দেহের সৌন্দর্যতাও বেড়েছে। অনাবিল হাসি আর তাঁর চাহুনির সঙ্গে গভীর রোম্যান্টিক কণ্ঠস্বরের প্রেমে পরে গিয়েছে বাঙালি।
তাঁর ডায়লগ বলার ভঙ্গিমাকে ভালবাসতে শুরু করেন অগণিত বাঙালি। বলতে গেলে তাঁর সমস্ত কিছু, তাঁর অভিব্যক্তিতে মন হারিয়ে বসেছিলেন বাংলা। সাধারণ মানের গল্পকে অসাধারণ করে তুলেছেন নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে। বাংলা ছবির “জুলিয়াস সিজার” হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মোটামুটি ১৯৭০-এর পর থেকেই নায়ক উত্তম কুমার হয়ে গেলেন ইন্ডাস্ট্রির ‘মহানায়ক’। ১৯৪৮-৫২ সাল পর্যন্ত যে চরম অসফলতা পেয়েছেন, তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়েই মূলত তিনি ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন। পাহাড়ী সান্যালের সঙ্গে ছবিতে কাজ করেছেন। বিকাশ রায় অসিতবরণ, সমসাময়িক অনিল-বসন্ত এবং বিশ্বজিৎ-সৌমিত্র-শুভেন্দুর সঙ্গে নিজের প্রতিভা শেয়ার করেছেন।
তাঁর চলাফেরা, হাসি-কান্না, প্রেম-ক্রোধে গা ভাসিয়েছে বাঙালি। আজও যার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। টিভির পর্দায় আজও তাঁর সিনেমা ফুটে উঠলে বাঙালি সমস্ত কাজ ভুলে তা দেখতে বসে পড়েন। এখনও তাঁর প্রতিভায় বুঁদ হয়ে তাঁর অগণিত ভক্ত। তাঁর মৃত্যুতে যেমন আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিল ইন্ডাস্ট্রি, ঠিক তেমনই উত্তম-আবেশে মুগ্ধ হয়েছিলেন সকলে। এমনকি হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলরও তাঁর অভিনয়ে তারিফ করেছেন। এখনো সকলের কাছে তিনিই একমাত্র ‘মহানায়ক’।





