ইরান যুদ্ধ, শুল্ক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের মধ্যেই ফের নতুন বিতর্কে জড়ালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে শেয়ার কেনাবেচা ঘিরে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ব্লুমমার্গ (Bloomberg)-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি শেয়ার লেনদেন করেছেন। অভিযোগ, এই লেনদেনের বড় অংশই এমন সব সংস্থাকে ঘিরে, যাদের ব্যবসা সরাসরি মার্কিন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল, আর্থিক বিশ্লেষক এবং ওয়াল স্ট্রিটে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন বহু সংস্থার শেয়ার কেনাবেচা করেছেন, যেগুলির উপর সরকারি অনুমতি, প্রতিরক্ষা নীতি কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব রয়েছে। তালিকায় রয়েছে এনভিডিয়া (NVIDIA), মাইক্রোসফ্ট (Microsoft), অ্যামাজন(Amazon) এবং Boeing-এর মতো বড় সংস্থার নাম। বিশেষ করে চিপ প্রস্তুতকারী সংস্থা এনভিডিয়া বা সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা বোয়িংয়ের মতো কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা করতে গেলে ওয়াশিংটনের অনুমতির প্রয়োজন হয়। সেই কারণে রাষ্ট্রনেতার তরফে এই ধরনের সংস্থার শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সিদ্ধান্তের আগাম খবর বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে বাজারে অস্বাভাবিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছে লেনদেনের পরিমাণ। গত বছরের শেষ তিন মাসে যেখানে প্রায় ৩৮০টি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সেই সংখ্যা এক লাফে ৩ হাজার ৭০০-তে পৌঁছেছে। ওয়াল স্ট্রিটের একাধিক ব্রোকারেজ সংস্থা এই ঘটনাকে “অস্বাভাবিক” বলেই ব্যাখ্যা করেছে। টাটল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের কর্ণধার ম্যাথিউ টাটল প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ক্ষমতায় থাকা কোনও রাষ্ট্রনেতার পক্ষে এত বিপুল শেয়ার লেনদেন অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তাঁর কথায়, এর নেপথ্যে কোনও গভীর পরিকল্পনা বা রাজনৈতিক সুবিধা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদিও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থেই কাজ করছেন ট্রাম্প এবং কোনও ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে তিনি বাজারে প্রভাব ফেলেননি।
এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেয় আমেরিকা। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতেই সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণকারী সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান, যার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর উপদেষ্টারা বিপুল পরিমাণে শেয়ার কেনাবেচা চালিয়ে গিয়েছেন। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ট্রাম্পের একাধিক প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি এবং যুদ্ধসংক্রান্ত মন্তব্য বাজারের ওঠানামাকে প্রভাবিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে প্রেসিডেন্ট পরিবারের আরেক বিতর্কিত অধ্যায়। গত বছর ট্রাম্প পরিবারের তরফে বাজারে সোনালি রঙের একটি নতুন স্মার্টফোন আনার ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ফোনের জন্য আগাম ১০০ ডলার জমা দিতে বলা হয় সমর্থকদের। প্রতিশ্রুতি ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফোন হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু বহু মাস কেটে গেলেও সেই ফোন বাজারে আসেনি। পরে জানা যায়, অগ্রিম নেওয়া অর্থ ফেরতেরও কোনও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। অভিযোগ, প্রায় ছ’লক্ষ মানুষ ওই প্রকল্পে টাকা জমা করেছিলেন, যার ফলে কয়েক কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে প্রেসিডেন্ট পরিবারের সংস্থা। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ বহু গ্রাহক সমাজমাধ্যমে সরব হন। ট্রাম্পের দুই পুত্রের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগও ওঠে। ফলে শেয়ার কেলেঙ্কারির বিতর্কের সঙ্গে এই স্মার্টফোন বিতর্ক জুড়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট পরিবারের ভাবমূর্তি আরও চাপে পড়েছে।
আরও পড়ুনঃ নতুন ছবি মুক্তি পেতেই ফের মর’ণরোগে আ’ক্রান্ত সঞ্জয় দত্ত? দেশে সম্ভব নয়, তড়িঘড়ি ক্যা*ন্সারের চিকিৎসা করাতে ছুটলেন বিদেশে! এখন কেমন আছেন অভিনেতা?
এ দিকে আগামী নভেম্বরে আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে শুল্কনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত আর্থিক বিতর্কে ক্রমশ চাপ বাড়ছে রিপাবলিকান শিবিরে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ আমেরিকাবাসীর একাংশ ইতিমধ্যেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সংকট এবং সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এড়ানো যাচ্ছে না। যদিও ট্রাম্প শিবির এখনও সমস্ত অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই দাবি করছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি, শেয়ার বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন এবং স্মার্টফোন বিতর্ক, সব মিলিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ঝড় তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।






