ইরানের রাজনীতি ও সমাজে পরিবর্তনের ইঙ্গিত নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে অস্বস্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে, তা আগের যে কোনও পর্যায়ের থেকে আলাদা। তেহরান হোক বা ইউরোপের কোনও শহর—ইরানি তরুণদের মধ্যে এক ধরনের আত্মপরিচয়ের খোঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই খোঁজ শুধু সরকারবিরোধী নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে দেওয়া আদর্শ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও। বিশেষ করে Gen-Z প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিক বদল এখন আর গোপনে নেই, প্রকাশ্যে আসছে নানা প্রতীকের মাধ্যমে।
এই বদলের সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ দেখা যায় লন্ডনে। ব্রিটেনের রাজধানীতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে এক বিক্ষোভকারী নামিয়ে দেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান পতাকা। তার বদলে অল্প সময়ের জন্য উত্তোলন করা হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ বা সিংহ-সূর্য পতাকা। এই পতাকা পারস্য সভ্যতার প্রাচীন ঐতিহ্য, ইসলাম-পূর্ব পরিচয় এবং রাজতান্ত্রিক অতীতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। দূতাবাসের বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা সেই মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েন, আর সেই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
লন্ডনের ঘটনার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে ইরানের ভেতরেও। প্রবাসী ইরানি সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সূত্রগুলির দাবি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেশজুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। বলা হচ্ছে, ৩১টি প্রদেশের বহু শহরে একযোগে প্রতিবাদ হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে এই পরিসংখ্যান স্বীকার করা হয়নি, তবুও বিক্ষোভের বিস্তার এবং তীব্রতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে তরুণদের উপস্থিতি এই আন্দোলনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
এই প্রতিবাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ। বিভিন্ন ভিডিও ও রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, একাধিক জায়গায় মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের সূত্রে দাবি, শুধু তেহরানেই এক রাতে বহু মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, কারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই এই শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ফলে এই আক্রমণকে অনেকেই আদর্শগত বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে পৌষ পার্বণ ঘিরে আতঙ্ক হিন্দু সমাজে ফতোয়ার ছায়ায় উৎসবের আনন্দ ম্লান
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের Gen-Z—যারা ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে বড় হয়েছে। কঠোর সামাজিক নিয়ম, বাধ্যতামূলক হিজাব, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে। অনেক তরুণ এখন ইসলামি বিপ্লবের বাইরে গিয়ে নিজেদের শিকড় খুঁজতে চাইছেন—পারস্য সভ্যতা, জরথুস্ত্রীয় ঐতিহ্য ও সূর্যোপাসনার ইতিহাসে। ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকার পুনরুত্থান সেই মানসিকতারই প্রতিফলন। এই আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ইরানকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা এখনও অনিশ্চিত—তবে একথা নিশ্চিত, এই প্রজন্ম আর আগের মতো নীরব নয়।






