রিষড়ার এক সাধারণ পরিবার—যেখানে প্রতিদিন সকাল হতো উৎকণ্ঠায়, আর রাত কেটেছে চোখের জলে। মা জানালার পাশে বসে থাকতেন, ফোনটা বেজে উঠলেই বুক ধড়ফড় করত স্ত্রীর। প্রতিবেশীরা এসে বলতেন, “কোনো খোঁজ পেলেন?” এতটুকু খবরের আশায় সকলে টিভির সামনে বসে থাকতেন। পূর্ণম কুমার সাউ, পেশায় বিএসএফ জওয়ান—কিন্তু তাঁর পরিবারের কাছে তিনি শুধুই ঘরের ছেলে। হঠাৎ করেই খবর এল, তিনি পাকিস্তানে! এরপর থেকেই যেন সময়টাই থমকে গিয়েছিল সাউ পরিবারে।
ছেলেকে ফেরাতে হন্যে হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন পরিবারের লোকেরা। স্ত্রী রজনী কখনও রাজ্য সরকারের কাছে, কখনও কেন্দ্রের মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কথা বলেন পূর্ণমের পরিবারের সঙ্গে। তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রকে চিঠি পাঠিয়ে দাবি জানান পূর্ণমকে ফেরানোর। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীও আশ্বাস দেন, সবরকম কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিবারের ভিতরে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন—”কখন ফিরবে আমাদের পূর্ণম?”
বাড়ির উঠোনে তখনও নীরবতা, কিন্তু ধীরে ধীরে ভেসে উঠতে লাগল আশার আভাস। সরকারি সূত্রে খবর আসে, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। জানা যায়, ২৪ এপ্রিল পাঞ্জাবের ফিরোজপুর সীমান্তে টহল দেওয়ার সময় ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করে ফেলেন পূর্ণম। সঙ্গে সঙ্গে পাক রেঞ্জার্স তাঁকে আটক করে। তার পর থেকেই প্রায় ২০ দিন ধরে বন্দি ছিলেন তিনি।
সীমান্তে জওয়ানদের জন্য বরাবরই কড়া নজরদারি থাকে। তবুও কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায়, যেমনটা ঘটেছিল পূর্ণমের ক্ষেত্রেও। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পাক সেনার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে, নিখুঁত কূটনৈতিক পদ্ধতিতে বিষয়টি মেটানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনের একাধিক শাখা। প্রতিটা দিন যেন ছিল টানটান উত্তেজনার, আর অপেক্ষার।
আরও পড়ুনঃ Barasat : পাক প্রধানমন্ত্রীর ছবির নিচে লিখেছিলেন ‘সেই’ শব্দ! রাস্তায় ফেলে রক্তাক্ত রিজুয়ান, কী ছিল সেই পোস্টে?
অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন এল। ১৪ মে সকালে আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পূর্ণমকে ভারতে ফিরিয়ে আনে পাক রেঞ্জার্স। সীমান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন রজনী, স্বামীকে দেখে চোখে জল আটকে রাখতে পারেননি। ২০ দিনের উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা আর কান্না এক নিমেষে উবে গেল। পূর্ণম এখন শুধু রিষড়ার নয়, গোটা দেশের কাছে সাহস আর গর্বের প্রতীক।






