সমাজ যত আধুনিক হচ্ছে, সম্পর্কের জটিলতাও যেন ততই বাড়ছে। প্রেম, বিশ্বাস, প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত আজকাল এমন সব ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, যা শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা সমাজকেই নাড়িয়ে দেয়। কখনও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, কখনও পারিবারিক চাপ, আবার কখনও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এসবের জেরে একের পর এক অপরাধের ঘটনা সামনে আসছে। মহারাষ্ট্রের পুণেতে ব্যবসায়ী পরিবারের তরুণ কেতন বিশাল আগরওয়ালের মৃত্যুর ঘটনাও সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। যে তরুণ কয়েক মাসের মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্ন দেখছিলেন, তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে এখন উঠে আসছে পরিকল্পিত খুনের অভিযোগ।
পুণে গ্রামীণ পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, গত ১৮ জুন বাগদত্তা সিয়া গোয়েল, তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু চেতন চৌধুরী এবং কয়েকজন পরিচিতকে নিয়ে পুণের ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন কেতন। পাহাড়ের উপরে ছবি তোলার সময় আচমকাই তিনি গভীর খাদে পড়ে যান। প্রথমদিকে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। পুলিশও মনে করেছিল, হয়তো ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, কেতনের মৃত্যু কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। ইতিমধ্যেই কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু চেতন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, সিয়ার সঙ্গে চেতনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কেতন। কারণ দুই পরিবারের সম্মতিতে কেতন ও সিয়ার বিয়ে প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। বিয়ের প্রস্তুতিও জোরকদমে চলছিল। এমনকি রাজস্থানের জয়পুরে একটি বিলাসবহুল প্রাসাদও বুক করা হয়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য। সেই প্রাসাদের বুকিং বাবদ প্রায় ১৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। দুই পরিবারের সদস্যরাও বিয়ে নিয়ে ভীষণ উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীদের দাবি, ব্যক্তিগত জীবনে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন সিয়া। আর সেই কারণেই নাকি কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, সিয়ার মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, কল ডিটেলস এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও সিয়ার বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার পরিকল্পনাও পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। কেতনকে জন্মদিন উপলক্ষে বেড়ানোর নামে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছে কেতনের মৃত্যুর পর সিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কেতনের মৃত্যুর পর ইনস্টাগ্রামে একাধিক আবেগঘন পোস্ট করেছিলেন সিয়া। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “আমার জন্মদিনে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে। আমাদের বিয়ের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি ছিল। আমি আজও বুঝতে পারছি না কেন তুমি এমন করলে।” অন্য একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “আমার হৃদয় জানে তুমি এখানেই আছ, প্লিজ ফিরে এসো।” এখন প্রশ্ন উঠছে, এই পোস্টগুলি কি সত্যিই শোক প্রকাশের জন্য ছিল, নাকি মানুষের সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা?
অন্যদিকে, কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়ালও বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ছেলের মৃত্যুর পর সিয়ার আচরণে কোনও দুঃখ বা শোকের ছাপ তিনি দেখতে পাননি। পুত্রহারা বাবার আক্ষেপ, “বিয়ে করতে না চাইলে না বললেই হত। আমার একমাত্র ছেলের জীবন কেড়ে নেওয়ার কী দরকার ছিল?” তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনার সঙ্গে মেঘালয়ের বহুচর্চিত রাজা রঘুবংশী হত্যাকাণ্ডেরও মিল খুঁজে পাচ্ছেন তদন্তকারীরা। সেখানেও স্বামীকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রেমিকের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছিল। পুণের এই ঘটনাও সেই একই ধরনের অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।
আরও পড়ুনঃ পদ্মভূষণ নিতে গিয়ে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লেন অলকা ইয়াগনিক! গায়িকার শারী’রিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ ভক্তদের, এখন কেমন আছেন তিনি?
বর্তমানে সিয়া গোয়েল ও চেতন চৌধুরী পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না। প্রেম, প্রতারণা, কোটি টাকার বিয়ে এবং এক তরুণের রহস্যমৃত্যু সব মিলিয়ে পুণের এই ঘটনা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আর সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন সত্যিই কি প্রেমিকের সঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য হবু স্বামীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল?






