বিশ্বাস মানুষের জীবনের অন্যতম বড় শক্তি। কঠিন সময়ে অনেকেই ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকদের আশ্রয় নেন, তাঁদের পরামর্শে জীবনের সমস্যার সমাধান খোঁজেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যখন কেউ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা এবং আর্থিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সম্প্রতি সামনে আসা এক ঘটনায় ফের প্রশ্ন উঠেছে, অন্ধ বিশ্বাসের আড়ালে কতটা বড় অপরাধ লুকিয়ে থাকতে পারে।
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বঘোষিত ধর্মগুরু রাধামোহন মিশ্র। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এক মহিলা তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীকে মানসিক, শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রায় পনেরো বছর আগে পারিবারিক সূত্রে রাধামোহন মিশ্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। প্রথমদিকে স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং পারিবারিক অশান্তির সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তিনি মহিলার এবং তাঁর পরিবারের আস্থা অর্জন করেন। ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাস এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে পরিবারের একাধিক সদস্য তাঁর প্রভাবের মধ্যে চলে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, রাধামোহন মিশ্র নিজেকে ঈশ্বরের অবতার বলে দাবি করতেন এবং সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই ভক্তদের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন।
মহিলার অভিযোগে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাঁর দাবি, বছরের পর বছর ধরে তাঁকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁকে বিভিন্নভাবে অপমান ও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে জোর করে প্রস্রাব পান করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনেও ব্যাপক হস্তক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। পাশাপাশি নিজের সম্পত্তির একটি অংশ অভিযুক্তের নামে লিখে দেওয়ার জন্যও তাঁকে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। বহুবার পরিবারের কাছে নির্যাতনের কথা জানালেও প্রথমদিকে তাঁকে বিশ্বাস করা হয়নি। পরে তিনি আশ্রমের প্রভাবমুক্ত হয়ে সমস্ত ঘটনা বিস্তারিতভাবে পরিবারের সদস্যদের জানালে তাঁরা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগ হাতে পাওয়ার পর পুলিশ গভীর রাতে অভিযানে নামে। অভিযানে রাধামোহন মিশ্র-সহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের মধ্যে ছয়জন মহিলা রয়েছেন। তদন্তকারীরা আশ্রমে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সামগ্রী উদ্ধার করেছেন। উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে রয়েছে ১৯টি হার্ড ডিস্ক, ১২টি ল্যাপটপ, একটি ট্যাবলেট, ১১টি মোবাইল ফোন, ২৩টি পেন ড্রাইভ এবং একাধিক ডিভিডি ও সিডি। এছাড়া প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার গয়না এবং প্রায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নগদ উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তল্লাশির সময় ১০টি বুলেটও পাওয়া গিয়েছে। যদিও কোনও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি, তবুও ওই বুলেটগুলির উৎস এবং সেগুলি কী উদ্দেশ্যে সেখানে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ২.৫ লক্ষ ব্রিটিশ নারী ধর্ষ*ণ ও যৌ’ন শো’ষণের শিকা’র দাবি রিপোর্টে! পাক ‘গ্রুমিং গ্যাং’ নিয়ে নতুন বিত’র্কে তোলপাড় ব্রিটেন, এত বছর ধরে সামনে আসা অভিযোগগুলিকে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই উপেক্ষা করা হয়েছিল?
তদন্ত চলাকালীন আরও একটি রহস্যজনক তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, আশ্রম হিসেবে ব্যবহৃত বাংলোটির নিচে একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ চলছিল। সেই সুড়ঙ্গের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি পালানোর রাস্তা হিসেবে তৈরি করা হচ্ছিল, নাকি অন্য কোনও গোপন কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। একইসঙ্গে উদ্ধার হওয়া হার্ড ডিস্ক, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সেখানে আরও কোনও সম্ভাব্য অপরাধ, আর্থিক লেনদেন বা নির্যাতনের তথ্য লুকিয়ে রয়েছে কি না। ইতিমধ্যেই রাধামোহন মিশ্র এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং মহারাষ্ট্রের কুসংস্কার ও অমানবিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনের একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। উল্লেখ্য, গোটা ঘটনাটি সামনে এসেছে মহারাষ্ট্রের পুনের ওয়াঘোলি এলাকার উবালেনগরে অবস্থিত একটি আশ্রমকে কেন্দ্র করে, যেখানে গত কয়েক বছর ধরে কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ অভিযুক্ত রাধামোহন মিশ্র।






