২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সভাকে কেন্দ্র করে ফের আইনি চর্চার কেন্দ্রে উঠে এল তৃণমূল কংগ্রেস। কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের হওয়া একটি আদালত অবমাননার মামলায় নোটিস পাঠানো হয়েছে দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অভিযোগ, গত বছরের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ উপলক্ষে শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা হাই কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশিকার পরিপন্থী। আদালতের এই পদক্ষেপের ফলে রাজনৈতিক মহল যেমন সরব হয়েছে, তেমনই প্রশাসনিক দায়িত্ব ও আদালতের নির্দেশ পালনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
শুক্রবার বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানির সময় আদালত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নোটিস জারি করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার নির্দেশ দেয়। জানা গিয়েছে, আগামী ৩ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানি হতে পারে। আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন হল, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই ধর্মতলার সভার সময় শহরের যান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছিল কি না এবং তা যদি হয়ে থাকে, তবে সেটি আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশ অমান্যের পর্যায়ে পড়ে কি না। এই কারণেই মামলাটি এখন রাজনৈতিক গণ্ডি ছাড়িয়ে আইনি গুরুত্বও অর্জন করেছে।
বর্তমান বিতর্কের সূত্র খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১৮ সালে। সে সময় কলকাতায় রাজনৈতিক সভা, মিছিল এবং কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ যানজট ও জনদুর্ভোগের অভিযোগে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় তৃণমূল কংগ্রেস-সহ মোট ৩৮টি রাজনৈতিক দলকে পক্ষ করা হয়েছিল। মামলার শুনানির পর হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য শহরের প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করা যাবে না। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, রাস্তার অন্তত একটি অংশ সবসময় যানবাহন ও পথচারীদের ব্যবহারের জন্য খোলা রাখতে হবে। একইসঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্স, দমকল বা অন্যান্য জরুরি পরিষেবার যান চলাচলে কোনও বাধা তৈরি করা যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া যান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা এবং সেই সংক্রান্ত তথ্য আগে থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও আদালত বলেছিল।
আবেদনকারীদের দাবি, গত বছরের ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সমাবেশের সময় এই নির্দেশিকাগুলির একাধিক ক্ষেত্রে লঙ্ঘন হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সভাকে ঘিরে ধর্মতলা এবং তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত থাকায় নিত্যযাত্রী, অফিসগামী মানুষ এবং জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া নাগরিকদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এমনকি জরুরি পরিষেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অসুবিধার অভিযোগ সামনে আসে বলে মামলাকারীদের দাবি। এই পরিস্থিতিকেই আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশ অমান্য করার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত এখন সেই অভিযোগের ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে চাইছে।
আরও পড়ুনঃ “ঈশ্বরের অবতার” দাবি করা ধর্মগুরুর আশ্রমে যৌ*ননির্যাতনের অভি’যোগ, উদ্ধার নগদ টাকা-গয়না…. রহস্যময় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ! পনেরো বছর ধরে চলা এই প্রভাবের জা’ল কি শুধুই আধ্যাত্মিকতার মুখোশ ছিল, নাকি বিশ্বাসের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়’ঙ্কর ফাঁ’দ?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মামলার প্রভাব শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আদালত যদি মনে করে যে পূর্ববর্তী নির্দেশ যথাযথভাবে মানা হয়নি, তাহলে ভবিষ্যতে রাজ্যের সব রাজনৈতিক দলের সভা-মিছিল আয়োজনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি ও স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি হতে পারে। একইসঙ্গে আদালতের নির্দেশ পালনের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলির দায়বদ্ধতাও নতুন করে আলোচনায় আসবে। এখন নজর ৩ জুলাইয়ের সম্ভাব্য শুনানির দিকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের সামনে কী ব্যাখ্যা দেন এবং হাই কোর্ট অভিযোগের গুরুত্ব কতটা বিবেচনা করে, তার উপরই নির্ভর করবে মামলার পরবর্তী দিকনির্দেশ। রাজনৈতিক এবং আইনি মহল তাই আগামী শুনানিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে।






