বিলুপ্তির পথে ছেলেবেলা! মুঠোফোনের হাত ধরেই হারিয়ে গেল টর্চ, ক্যালেন্ডার, অ্যালার্ম ঘড়ি, রেডিও

সকালবেলা অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম থেকে ওঠা। তারপর অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুম ঘুম চোখে খবরের কাগজ খুলে বসা। তারপর ধূমায়িত এক কাপ সহযোগে খবরের শিরোনামে চোখ বোলানো। আমরা যারা আট বা নয়ের দশকে বেড়ে উঠেছি, তারা নিজেদের বাবা-দাদুদের সকাল সকাল এমন রুটিনই ফলো করতে দেখেছি। কিন্তু ২০২৩ সালে দাঁড়িয়ে এখন পুরোটাই নস্টালজিয়া।

এখনও অ্যালার্মের শব্দেই আমাদের ঘুম ভাঙে বটে, তবে সেটা অ্যালার্ম ঘড়িতে নয়, মোবাইলে। এখনও খবরের শিরোনামে আমরা চোখ বোলাই, তবে খবরের কাগজ সামনে খুলে নয়, বরং মোবাইলের স্ক্রিনে। কোনও বিশেষ তারিখ দেখতে আর দেওালে টাঙানো ক্যালেন্ডারের প্রয়োজন পড়ে না, হাতের ফোনেই সেই কাজ মিটে যায়।

মাত্র ২০-২২ বছর আগে আবিষ্কার হওয়া একটা ছোট্ট ডিভাইস মানুষের জীবন যে এত দ্রুত বদলে দেবে, সমস্ত অভ্যেস পাল্টে দেবে, তা কী কেউ কখনও ভেবেছিল! বা ভেবেছিল বোধ নয়, যার কারণেই একের মধ্যে সবকিছুর সুবিধা দেওয়ার তাড়না। সেই ক্যালকুলেটর খুলে হিসাব বা দূরের আত্মীয়ের চিঠি বা ফোন বুথে বা বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করা, এসব জেন জি (Gen Z)-র কাছে শুধুই গল্পকথা। তাদের কাছে এই আবেগ একেবারেই অচেনা।

মুঠোফোন কী কী কেড়ে নিল আমাদের জীবন থেকে?

ফোন বুথ – রাস্তায় বেরিয়ে ফোন বুথ থেকে ফোন করেননি, এমন মানুষ পাওয়া ভার ছিল। কিন্তু এখন আর কোথাও দেখা মেলে না সেই ফোন বুথের।

ক্যামেরা– কোন ক্যামেরার পিক্সেল কত, সেই হিসেবের প্রয়োজন নেই। মোবাইলেই এখন কাজ মিটে যায়।

টিভি- টিভি সেভাবে এখন কেউ দেখেন না। ওটিটি বা লাইভ টিভি দেখে নেওয়া যায় মোবাইলে।

হাতঘড়ি– কেউ যদি এখন জিজ্ঞেস করেন যে কটা বাজে, তাহলে আর হাতঘড়ি দেখার প্রয়োজন পড়ে না, মোবাইলে চোখ দিলেই হয়ে যায়।

ভিসিআর– একসময় সিডি কিনে বা ভাড়া করে এনে বাড়িতে সিনেমা দেখা ছিল যেন বিলাসিতা। এখনও ওটিটি সাবস্ক্রাইব করে নিলেই হাজার হাজার অপশন। ভিসিআর আর কোথায়!

ক্যালেন্ডার– বাড়ির দেওয়াল থেকে বিদায় নিয়েছে ক্যালেন্ডার। মোবাইলে অ্যাপ দেখলেই সব তারিখ চোখের সামনে।

টর্চ– লোডশেডিংয়ের সময় টর্চ জ্বেলে কোথাও যাওয়া ছিল এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। আজ মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটই যথেষ্ট।

অ্যালবাম– স্মৃতিমাখানো ছবির অ্যালবাম এখন যেন অতীত। অ্যালবামও এখন মোবাইলের মধ্যেই।

রেডিও– একসময় প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে থাকত রেডিও। গান, নাটক, খবর সবই চলত রেডিওতে। এখন সব অতীত। স্মার্টফোনেই শুনতে পারেন রেডিওর সব অনুষ্ঠান।

নগদ টাকা– নগদ টাকার ব্যবহারও প্রায় শেষ হওয়ার পথে। মোবাইল অ্যাপে এক ক্লিকের মাধ্যমেই এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার হয়ে যায়।

স্কুল পড়ুয়ার ঘরে নেই গ্লোব কিংবা ম্যাপ, বইয়ের তাকে নেই ডিকশনারি আর দেখা যায় না। সবটাই তো এখন মোবাইলের স্ক্রিনে। এই শুধুমাত্র রেডিও, ক্যালেন্ডার, টর্চ, অ্যালার্ম ঘড়ি কেন, আর কিছু বছর বাদে হয়ত এই তালিকা আরও বাড়বে। আরও আধুনিক হয়ে উঠব আমরা, আর ছোটবেলার সেই অভ্যেসগুলো শুধু স্মৃতি হয়েই থেকে যাবে মনের মণিকোঠরে।

RELATED Articles