মহালয়া থেকেই যে বঙ্গবাসীর মনে পুজোর হিমেল পরশ লেগে যায়, সেকথা নতুন কিছু নয়। বিগত কয়েক বছর ধরেই এমন চলছে। মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় প্যান্ডেল হপিং। তবে এই বছর আর জি কর কাণ্ডের জেরে প্রথমের দিকে পুজোর আমেজ যেন ফিকেই লাগছিল। মানুষ পুজো কতটা উপভোগ করবে, তা নিয়ে ধন্ধেই ছিলেন অনেকে। তবে মহালয়ার সন্ধ্যে যেন সেসব কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করল। আরও একবার প্রমাণিত, দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই কারণেই তো মহালয়া থেকেই নানান মণ্ডপে দেখা মিলল উপচে পড়া ভিড়।
মণ্ডপে মণ্ডপে এমন ভিড় দেখে এবার ময়দানে নেমে পড়ল তৃণমূলও। উৎসবে না ফেরা নিয়ে যারা মন্তব্য করেছিলেন, তাদেরই একহাত নেওয়ার এত ভালো সুযোগ কী আর ছাড়া যায়! জনসাধারণের এই জনস্রোতকে তৃণমূল হয়ত নিজেদের নৈতিক জয় হিসেবেই দেখছে। সেই কারণেই বিরোধীদের কটাক্ষ করতে দেরি করলেন না তিনি।
আর জি কর কাণ্ডের বিচার চেয়ে যখন আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে, সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘একমাস হয়ে গিয়েছে, এবার উৎসবে ফিরুন’। সেই সময় তাঁর এই মন্তব্যকে তুমুল কটাক্ষ করা হয়। সকলেরই প্রশ্ন ছিল, এমন এক স্পর্শকাতর ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে উৎসবে ফেরার বার্তা দিতে পারেন। অনেকেই আবার ‘উৎসবে ফিরছি না’ বলে সোশ্যাল মিডিয়া ভরিয়েছিলেন।
তবে মহালয়ার দিন আসতেই সবটা যেন বদলে গেল। সন্ধ্যে নামতেই শ্রীভূমি হোক বা কল্যাণী আইটিআই, যে সমস্ত মণ্ডপ উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে, সেখানে দেখা গেল লাগামছাড়া ভিড়। আর সেই ভিড়ের ছবি দেখে তৃণমূলের মুখে চওড়া হাসি না আসলে হয়। এই ভিড় দেখিয়েই বিরোধীদের খোঁচা দিতে ছাড়লেন না দেবাংশু ভট্টাচার্য বা অরূপ চক্রবর্তীরা।
দেবাংশু সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন, “শ্রীভূমি থেকে কল্যাণী আইটিআই মহালয়ার দিন থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে জনজোয়ার। যারা উৎসব বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন,উৎসবে ফিরছি না বলে পিওর বাম সুলভ স্লোগান তুলেছিলেন, সাধারণ মানুষ তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছেন গরিবের পেটে লাথি মেরে উৎসব বয়কট কোনও সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ নয়। মুখ্যমন্ত্রী সেই গরিব গুলোর জন্যেই বলেছিলেন উৎসবে আসুন..বলেননি, বিচার ভুলে উৎসবে ফিরুন..।
অরূপ চক্রবর্তীর কথায়, “উৎসবে ফিরছি না কীভাবে মহালয়াতেই জনসমুদ্র হয়ে গেল! কল্যাণী লুমিনাসেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে ত্রিধারা-সুরুচি বড়িশা-বাদামতলা-নাকতলার ফিতে কাটা হয়ে গেলে কী হবে?….সুবিধাবাদী মাকুর দল আবার এই সুযোগে লাল শালু খাটিয়ে টাকা কামাতে প্যান্ডেলের পাশে বুকস্টলের বাঁশ বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে”।
মহালয়ার দিনই এমন ভিড়ের ছবি চোখে পড়তে প্রশ্ন উঠতে তো শুরু ক্রেছেই যে তাহলে কী বিচার ভুলে সত্যিই উৎসবে ফিরছে বাঙালি? যদিও এখনই সবটা অনুমান করে নেওয়া ঠিক নয়। পুজোর আসল দিনগুলো এখনও বাকি। তবে অনেকেই আবার বলছেন, দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ। দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে যাওয়া মানেই বিচারের দাবী থেকে সরে আসা নয়। পুজোও চলবে, বিচারের দাবীও অব্যাহত থাকবে। উৎসব আর প্রতিবাদ সমান্তরালে চলে নাকি উৎসব সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার!





