পরিবারের ভালোবাসা আর স্নেহের পরশেই তো একজন মানুষ বৃদ্ধ বয়সে একটু শান্তি খোঁজেন। সন্তানদের ছোট থেকে বড় করার পর আশা থাকে, বৃদ্ধ বয়সে তারাই দেখাশোনা করবে। কিন্তু সময় বদলায়, সম্পর্কের সমীকরণও বদলে যায়। বহু বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই আজকের দিনে সন্তানদের কাছে অবহেলিত, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছেন। শহরের ব্যস্ত জীবনে মা-বাবার জন্য জায়গা রাখার সময় যেন অনেকেরই নেই! বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও তাই দিন দিন বাড়ছে। যেখানে আশ্রয় পেয়ে কেউ কেউ শান্তিতে থাকেন, আবার কেউ সেখানে পৌঁছে নতুন এক দুঃস্বপ্নের সম্মুখীন হন।
ঠিক তেমনই এক করুণ বাস্তবের শিকার হলেন উত্তর কলকাতার হাতিবাগানের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব শর্মিষ্ঠা মুস্তাফি। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলে চেতন মুস্তাফির সংসারে ঠাঁই হয়নি তাঁর। শেষে বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তাঁর ঠিকানা। কিন্তু সেখানেও শান্তি পেলেন না তিনি। অভিযোগ, বৃদ্ধাশ্রমে তাঁকে দিয়ে গৃহপরিচারিকার মতো কাজ করানো হতো, এমনকি মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে! শেষমেশ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হন শর্মিষ্ঠা।
স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের সংসারে ঠাঁই হয়নি
শর্মিষ্ঠা মুস্তাফির স্বামী অশেষ মুস্তাফি দার্জিলিংয়ে হোটেলের ব্যবসা করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে ছেলে চেতন ও পুত্রবধূর সঙ্গেই থাকতেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সংসারে তাঁর জায়গা ছোট হতে থাকে। শেষমেশ ২০২১ সালে ছেলেই তাঁকে মধ্যমগ্রামের দিগবেরিয়ার একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। প্রথমে মাসে ৬ হাজার টাকা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালেও পরে এককালীন ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে জানিয়ে দেন, এটাই শেষ। এরপর থেকে মায়ের দায়িত্ব বৃদ্ধাশ্রমের।
বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে নতুন দুঃস্বপ্ন
শর্মিষ্ঠার অভিযোগ, বৃদ্ধাশ্রমের মালকিন নীপা রায় সরকার তাঁকে দিয়ে নানা কাজ করাতেন। রান্না, বাসন মাজা থেকে শুরু করে তাঁর নিজের বাড়িতেও নিয়ে গিয়ে কাজ করানো হতো। এসব কাজ করতে অস্বীকার করলেই চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এমনকি তাঁকে প্রতিদিন বিষ জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন শর্মিষ্ঠা। তাঁর কথায়, “আমার উচ্চ রক্তচাপ, সুগার, থাইরয়েডের সমস্যা আছে। আমাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করতে চেয়েছিল ওরা।”
শেষমেশ পুলিশের দ্বারস্থ শর্মিষ্ঠা
এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দিন তিনেক আগে বৃদ্ধাশ্রম থেকে পালিয়ে মধ্যমগ্রাম থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন শর্মিষ্ঠা। বর্তমানে তিনি বৃদ্ধাশ্রমের এক প্রাক্তন কর্মী সঞ্জীব বাগের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সঞ্জীব তাঁকে নিজের মায়ের মতো দেখাশোনা করছেন বলে জানান শর্মিষ্ঠা। তবে ছেলে চেতন সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, “মা বাড়িতে অ্যালকোহল খেতেন, গ্যাস জ্বালিয়ে রাখতেন। তাই বাধ্য হয়েই তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হয়েছে। যদি মা ঠিক করে চলেন, তবে ফিরিয়ে আনতে আপত্তি নেই।”
আরও পড়ুনঃ SSC scam : বেতন ফেরত না দিলে আইনি ব্যবস্থা! বেআইনি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ সুপ্রিম কোর্টের!
এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এভাবেই কি একের পর এক বৃদ্ধা মায়ের শেষ আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রম হবে? সমাজ কি আদৌ এই নির্মম বাস্তব থেকে মুক্তির পথ দেখাবে?





