দিনের পর দিন বাড়ছে তাপপ্রবাহ, ‘সুপার এল নিনো’-র প্রভাবে কি পৃথিবী এগোচ্ছে ভয়াবহ খরা, দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে?

বিশ্বজুড়ে ক্রমশ তাপমাত্রা বাড়ছে, আর তার মধ্যেই নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, ২০২৬-২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। ইতিহাস বলছে, এর আগে ১৮৭৭ সালে এমনই এক তীব্র এল নিনোর জেরে পৃথিবী জুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা এবং দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি হতে পারে কি না, তা নিয়েই এখন উদ্বেগ বাড়ছে বিজ্ঞানী মহলে।

‘এল নিনো’ শব্দটির উৎপত্তি স্প্যানিশ ভাষা থেকে, যার অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। কিন্তু নামের সঙ্গে এর প্রভাবের কোনও মিল নেই। এটি আসলে প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা প্রতি ২ থেকে ৭ বছর অন্তর ঘটে। সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে চিলি ও পেরুর কাছে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা আশপাশের বায়ুমণ্ডলকেও দ্রুত গরম করে তোলে।

এই প্রক্রিয়ার ফলে সমুদ্রের স্বাভাবিক তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশের জল বেশি উষ্ণ এবং পূর্ব অংশ অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে। কিন্তু এল নিনোর সময় সেই ভারসাম্য উল্টে যায়। উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঠান্ডা জল উপরে উঠতে পারে না। ফলে সমুদ্র আরও গরম হতে থাকে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্বের আবহাওয়ার উপর। এর ফলে কোথাও তীব্র খরা, কোথাও আবার অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ব উষ্ণায়নের পরিস্থিতিতে এল নিনোর প্রভাব আরও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ‘সুপার এল নিনো’-তে রূপ নিতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে তাপপ্রবাহ চরম আকার নেবে, কৃষি বিপর্যস্ত হবে এবং বহু অঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। ১৮৭৭ সালের ঘটনায় তৎকালীন বিশ্বের প্রায় ৪ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। বর্তমান জনসংখ্যার নিরিখে সেই সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলেই আশঙ্কা।

এল নিনোর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এর প্রভাব পড়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরম ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়। উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলেও উত্তরাঞ্চলে শীত তুলনামূলক উষ্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, একদিকে যেমন গরম বাড়ে, অন্যদিকে আবহাওয়ার ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

ভারতের ক্ষেত্রেও এল নিনোর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষি ব্যবস্থা অনেকটাই বর্ষার উপর নির্ভরশীল। এল নিনোর কারণে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়লে ফসল উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগে। এর ফলে খাদ্য সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে জল সংকট, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং পর্যটন শিল্পেও প্রভাব পড়ে। অতীতে ২০০৯, ২০১৫-এর মতো বছরগুলিতে এল নিনোর প্রভাবে ভারতে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৫১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে হওয়া ১৫টি এল নিনোর মধ্যে ৯ বারই ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ তীব্র গরমে নির্বাচনী সভা, হেলিকপ্টারে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল দেবের! শারীরিক অবস্থার কারণে প্রচারে বাধা! এখন কেমন আছেন অভিনেতা?

বর্তমানে আবহাওয়াবিদদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর মিলিত প্রভাব। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগেই বেড়ে গেছে, তার উপর এল নিনো যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, আগে যেসব ঘটনা বিরল ছিল, এখন তা ঘন ঘন ঘটছে এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে। ২০২৭ সালের সম্ভাব্য সুপার এল নিনো যদি বাস্তব হয়, তবে তা শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, মানব সভ্যতার উপরও বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া এবং পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়াই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Khabor24x7 NewsDesk

আরও পড়ুন

RELATED Articles